

টেক্সটাইল টুডে ইনোভেশন হাব আয়োজিত টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট সিজন ৯, প্রেজেন্টস বাই সেন্ট্রো টেক্স লিমিটেড, পাওয়ার্ড বাই ইউরোডাই সিটিসি- এর গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধববার (১২ নভেম্বর) ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠান চলাকালীন, চূড়ান্ত প্রতিযোগীরা টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবনী ধারণা এবং সমাধান উপস্থাপন করেন। এসময় অতিথিরা প্রতিযোগীদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করেন এবং এই ধরনের উদ্ভাবন বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি, বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিজিবিএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মোরশেদ আলম, এফবিসিসিআই এর সাবেক প্রশাসক মোঃ হাফিজুর রহমান এবং আইটিইটির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার মোঃ এনায়েত হোসেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন আইটিইটি এর আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার এহসানুল করিম কায়সার এবং টেক্সটাইল টুডে ইনোভেশন হাবের নির্বাহী চেয়ারম্যান। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান।
প্রধান অতিথির ভাষণে বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ইনোভেশন, দক্ষতা (ইফিসিয়েন্সি) এবং মেন্টরশিপের কোন বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, দেশের টেক্সটাইল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে উৎপাদনমুখী করতে হবে। অনেক টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট আধুনিক ও দামি যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। কারন শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে সংযোগের অভাব রয়েছে।
বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আরও বলেন, যদি শিক্ষার্থীরা কারখানার মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তব কাজের চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে, তাহলে সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব। ইনোভেশনকে সিস্টেমেটিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রোডাক্টিভিটির (উৎপাদনক্ষমতা) সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে প্রচুর প্রযুক্তিগত (টেকনিক্যাল) ও নান্দনিক (এস্থেটিক) ইনোভেশনের সুযোগ রয়েছে। তবে নন–ভ্যালু অ্যাডেড কার্যক্রম বন্ধ করে সময় ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে মেন্টরশিপ বা দিকনির্দেশনা সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বশির উদ্দিন বলেন, প্রত্যেকেরই একজন মেন্টর দরকার। যারা পেশাগত জীবনে সফল হয়েছেন, তাদের উচিত তরুণদের সঠিক পথে অনুপ্রাণিত ও গাইড করা। শুধুমাত্র শ্রম ও খরচ কমানো নয়, বরং ইনোভেশন ও দক্ষ বিনিয়োগই বাংলাদেশের শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে বলেও জানান তিনি।
টেক্সটাইল খাতকে জাতীয় সমৃদ্ধির বাহন হিসেবে উল্লেখ করে বশির উদ্দিন বলেন, টেক্সটাইলের ইতিহাস গভীর। ম্যানচেস্টারে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছিল টেক্সটাইল থেকেই। বাংলাদেশও টেক্সটাইলের মাধ্যমে উচ্চমানের মূল্য সংযোজন অর্জন করে দেশের অর্থনীতি পরিবর্তন করতে সক্ষম। তিনি বলেন টেক্সটাইল এমন এক যান যা একজন দেশকে ধনী করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে। এটি শিল্প-নীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দাবি করে।
দীর্ঘ সময় ধরে টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি এখন বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের তরুণ উদ্ভাবক, গবেষক ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদের জন্য একটি উদ্ভাবনমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এ বছর প্রায় ২,০০০ শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করা ১০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে ইনোভেশন মাস্টারমাইন্ড হিসেবে প্রশিক্ষণ, গ্রুমিং ও গবেষণা প্রকল্পে কাজের সুযোগ পান। এর মধ্য থেকে শীর্ষ ৭টি উদ্ভাবনী প্রকল্পকে চুড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়।
শীর্ষ ৭টি উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো হলো:
শতভাগ কটন সিঙ্গেল জার্সি ফ্যাব্রিকে স্টিম খরচ হ্রাস, ইন্টেলিজেন্ট ইয়ার্ন ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের জন্য ক্লাউড ইন্টিগ্রেটেড লীন সিস্টেম, পানি, সময় ও রাসায়নিক ব্যবহারে সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ডাইং প্রক্রিয়ার পুনঃনকশা, হালকা শেডের জন্য শতভাগ কটন নিট ফ্যাব্রিক ডাইংয়ে আরএফটি উন্নয়ন, শতভাগ কটন ডাইংয়ে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, রিং ও রোটর ইয়ার্নের জন্য দুটি ভিন্ন প্রযুক্তিতে প্রি-কনজিউমার বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং শতভাগ কটন নিটেড ফ্যাব্রিক ডাইংয়ে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস।
প্রকল্পগুলির মধ্যে, শতভাগ কটন সিঙ্গেল জার্সি ফ্যাব্রিকে স্টিম খরচ হ্রাসে প্রথম পুরস্কার জিতেছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, শতভাগ কটন নিটেড ফ্যাব্রিক ডাইংয়ে উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে দ্বিতীয় পুরস্কার জিতেছে ১০লাখ টাকা এবং শতভাগ কটন ডাইংয়ে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করায় তৃতীয় পুরস্কার জিতেছে ৭৫ হাজার টাকা। বিচারকদের প্যানেল কর্তৃক নির্ধারিত এই ৭টি প্রকল্পের চূড়ান্ত গ্রুপ উপস্থাপনার পর বিজয়ীদের হাতে ট্রফি এবং পুরস্কারের চেক হস্তান্তর করা হয়।
আইএমদের মধ্যে, বুটেক্সের বায়েজিদ আহমেদ চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ১ লাখ টাকা পুরস্কার জিতেছেন। বুটেক্সের মোঃ আব্দুল ওহাব শামস প্রথম রানার আপ এবং নিটারের মোঃ ইমতিয়াস ইমাম দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছেন এবং যথাক্রমে ৪৫ হাজার এবং ৩০ হাজার টাকা পুরস্কার পেয়েছেন।
বিচারক প্যানেলে ছিলেন বিইউএফটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান, বুটেক্সের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শিয়াক, আরএইচ কর্পোরেশনের (আজিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান) নির্বাহী পরিচালক এ এস এম হাফিজুর রহমান নিক্সন, এসেনশিয়াল ক্লথিং লিমিটেডের পরিচালক মোঃ মতিউর রহমান রবিন।
এর আগে শীর্ষ ১০০ ইনোভেশন মাস্টারমাইন্ড পেয়েছে ৩০ লাখ টাকার সমমূল্যের প্রশিক্ষণ এবং অতিরিক্ত ১২ লাখ টাকার স্কলারশিপ সুবিধা। বিভিন্ন শিল্প বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকৃত সমস্যা সমাধানের জন্য ইনোভেশন মাস্টারমাইন্ডদের বিভিন্ন টেক্সটাইল এবং পোশাক কারখানায় মোতায়েন করা হয়েছে।
গ্র্যান্ড ফিনালেতে, একটি পোস্টার প্রদর্শনী ছিল যেখানে সেরা ১২টি প্রকল্প প্রদর্শিত হয়েছিল এবং এর মধ্যে সেরা পোস্টারকে ২০ হাজার টাকা পুরষ্কার দেওয়া হয়। এছাড়াও, "উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ জয়" শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্যানেলিস্টরা টেক্সটাইল এবং পোশাক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলি কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে এবং উদ্ভাবনীতার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের মূল্যবান ধারণা প্রদান করেন।
প্যানেল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ পরিচালক এবং এপিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মো. হাসিব উদ্দিন, সালমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ শোয়েব, অকো-টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনাপ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান সিআইপি এবং এসেনশিয়াল ক্লোথিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম খান। প্যানেল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন কটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং টেক্সটাইল টুডের নির্বাহী সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হাসান।
টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট সিজন-৯ এ, প্রদর্শিত ধারণা এবং প্রকল্পগুলি কেবল টেক্সটাইল শিল্পের গভীর উপলব্ধিই প্রতিফলিত করেনি বরং উদ্ভাবন, উন্নতি এবং আরও টেকসই ভবিষ্যত তৈরির আবেগকেও প্রতিফলিত করে।
এ আয়োজনে সেন্ট্রো টেক্স লিমিটেড ছিল টাইটেল স্পন্সর, ইউরো ডাই সিটিসি ছিল পাওয়ার্ড বাই বাই স্পন্সর, ডাইসিন গ্রুপ এবং সিএইচটি ছিল প্ল্যাটিনাম স্পন্সর, যেখানে আপনা অর্গানিকস প্রাইভেট লিমিটেড ছিল ডায়মন্ড স্পন্সর, সামিট ডাই কেম ছিল গোল্ড স্পন্সর এবং ডেনিম সলিউশন ছিল স্পন্সর। সেইসাথে কোটস ছিল প্রাইজ মানি স্পন্সর, যেখানে ট্রান্সফার কেমিক্যাল ছিল রিসার্চ পার্টনার, এসজিএস লিমিটেড ছিল কোয়ালিটি পার্টনার, জিআইজেড ছিল ইন অ্যাসোসিয়েশন পার্টনার এবং টেক্সমেটা ছিল নেটওয়ার্ক পার্টনার।
সহযোগী কারখানা হিসাবে ছিল এসেনশিয়াল ক্লোথিং লিমিটেড, আর্মাদা স্পিনিং মিলস লিমিটেড, আল-মুসলিম গ্রুপ, অকো-টেক্স গ্রুপ, সালমা গ্রুপ, হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড, সাইহাম ডেনিমস লিমিটেড, সাউথ ওয়েস্ট কম্পোজিট লিমিটেড, অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড, মোশারফ গ্রুপ, এন.এ.জেড বাংলাদেশ লিমিটেড, র্যাডিক্যাল ডিজাইন লিমিটেড, নিট কনসার্ন গ্রুপ এবং ইব্রাহিম নিট গার্মেন্টস (প্রা.) লি.। এ সকল প্রতিষ্ঠান তরুণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব শিল্প সমস্যার সমাধান ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বাড়াতে বাস্তবভিত্তিক কাজের সুযোগ দিয়েছে।
টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট (টিটিএইচ) টেক্সটাইল টুডে ইনোভেশন হাবের একটি উদ্যোগ। এটি টেক্সটাইল, পোশাক, ফ্যাশন এবং যেকোনো বিষয়ে অধ্যয়নরত স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম প্রতিভা তৈরির প্রতিযোগিতা। টিটিএইচের উদ্দেশ্য হল আধুনিক পদ্ধতিতে উদ্ভাবন (গবেষণা বা জ্ঞান সৃষ্টি) প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বশেষ উন্নয়ন গ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ, সাজসজ্জা এবং পরামর্শ দানের মাধ্যমে ভবিষ্যতের নেতাদের প্রস্তুত করা।
বিএইচ