ভালো লভ্যাংশ দেয়া স্বত্তেও বন্ধের পথে এগোচ্ছে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড, কার স্বার্থে বিএসইসির এই পদক্ষেপ?
সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-১১-১৯ ১২:১৮:৪৫

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। লেনদেন যেখানে দুই মাস আগেও ছিল ১,৫০০ কোটি টাকা, সেখানে তা আজ নেমে এসেছে মাত্র ২০০ কোটিতে। হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা, অনেকে কার্যত নিঃস্ব। বাজারের এই ধস কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি সরাসরি এসেছে পুঁজিবাজারবিরোধী দুই বিধিমালা: মার্জিন রুলস এবং মিউচুয়াল ফান্ড রুলস ২০২৫ থেকে। বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব নীতির আড়ালে চলছে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বন্ধ করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিশ্ব বাজারের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ ভীষণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের ফলে এই খাতটি বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। বিগত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সময়ে কিছু অনৈতিক বিধিমালা প্রবর্তনের কারনে এ খাতটিতে যে ধ্বস নেমে এসেছিলো তা এখনো বিদ্যমান। কেননা সেই দোসরদের কার্যক্রম এখনো চলমান। এক্ষেত্রে সরকার এবং উপর মহলের পক্ষ থেকে সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
গত দুই দশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা, নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন এবং বিনিয়োগ বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি ছিল মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড। ২০০৮ সালে এই সেক্টরের আকার ছিলো ২০০০ কোটি টাকা যা এখন বেড়ে ১০,০০০ কোটি হয়েছে। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে বিনিয়োগকারীরা এর সুফল ভোগ করতে শুরু করে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো বিগত ৫ বছরে বিনিয়োগকারীদের ১৩৫১.৩৩ কোটি টাকা ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে, যা এই মন্দা বাজারে উল্লেখযোগ্য।
মেয়াদী ফান্ডগুলো থেকে বছরের পর বছর ডিভিডেন্ড পেয়ে আসছে বিনিয়োগকারীরা।
বিগত ৫ বছরের মেয়াদী ফান্ডগুলোর ক্যাশ ডিভিডেন্ড (কোটি টাকায়) এর চিত্রঃ
| ফান্ড ম্যানেজার | ২০১৯-২০২৪ |
| এইমস | ১২৭.৮৭ |
| এশিয়ান টাইগার | ১৬.৯৯ |
| সিএপিএম | ৩৯.৭৭ |
| আইসিবি এএমসিএল | ১৮৪.৩৫ |
| এলআরগ্লোবাল | ২৩৪.৪৮ |
| রেইস | ৬১২.১৬ |
| এসইএমএল | ৬৩.৫৮ |
| ভ্যানগার্ড | ৩৯.২৮ |
| ভিআইপিবি | ৩২.৮৪ |
| সর্বমোট | ১৩৫১.৩৩ |
বাজার ভারসাম্য রক্ষায় ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডঃ
দীর্ঘ মেয়াদে পুজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের কান্ডারি ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মার্কেট এক্সপোজারঃ
| সম্পদ ব্যবস্থাপক | এক্সপোজার |
| ভ্যানগার্ড | ৭৯.৯% |
| এল আর গ্লোবাল | ৬৮.৮% |
| রেইস | ৭২.৪% |
| এইমস | ৭৫.১% |
| আইসিবি এএমসিএল | ৯৭.৩% |
| ক্যাপিটেক | ৮২.৮% |
উপরোক্ত ছক থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান যে, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের অধিকাংশ সম্পদই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকৃত। যা পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী ও স্বার্থান্বেষী কিছু মহলের ভূল ও মিথ্যা অপপ্রচারে এই খাত এখন বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। বাজারের এই দুরাবস্থার দ্বায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এড়াতে পারে না। অথচ এ অবস্থার জন্য বাজার মধ্যস্থতাকারীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা দ্বায় মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস-এর সিনিয়র অ্যাডভাইজর (রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) ড. একেএম মাজহারুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করেন যে, ”২০ বছরে গড়ে ওঠা ১০,০০০ কোটি টাকার একটি সেক্টরকে এক ঝটকায় নিশ্চিহ্ন করা কোনো অর্জন নয় এবং এটি পুঁজিবাজারের জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল আনবে না। তাঁর মতে, ক্লোজ-এন্ড ফান্ডগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া এমনিতেই দুর্বল ও অপ্রতুল মূলধন বাজারে ব্যাপক বিক্রয় চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ মূলধন পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সেক্টর গড়ে উঠতে লম্বা সময় লেগেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত লাখো বিনিয়োগকারী ও হাজারো পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। এমতাবস্থায় অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা বোঝা মুশকিল। এটি বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নজীরবিহীন এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসেও এমন পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’’
ড. মাজহার আরো বলেন, “এ বিষয়ে তাদের অবস্থান বিএসইসিকে জানানো হয়েছে। তবে কমিশন শুধু এই আইনটিকে “দ্রুত বাস্তবায়ন” করতে আগ্রহী। অংশীজনের মতামত বা এ ধরনের সিদ্ধান্তের আইনগত যৌক্তিকতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ খুবই সীমিত।”
বাংলাদেশে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বহু বছর ধরে কার্যকর, পরীক্ষিত এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ কাঠামো। আন্তর্জাতিক বাজার যেখানে এই খাতকে শক্তিশালী করছে, সেখানে বাংলাদেশে এর বিপরীত পথে হাঁটা নিঃসন্দেহে বাজারকে অস্থিতিশীল করার বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। মেয়াদী ফান্ড বাজারের গভীরতা বাড়ায়, অর্থনীতিকে গতিশীল করে। তাই বিলুপ্তি নয় – সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের একমাত্র লক্ষ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে ধসের কিনারায় দাঁড়িয়ে—মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত তাকে আরও তলিয়ে দেবে।
এসকেএস







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













