ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি

ইসলামী ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ এখন খেলাপি

সানবিডি২৪ প্রতিবেদকজাহাঙ্গির আলম আনসারী প্রকাশ: ২০২৫-১২-১২ ১৯:৫৪:৫৮


>> এক বছরে খেলাপি বেড়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা; প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৮৬ হাজার কোটি

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র একের পর এক বেরিয়ে আসছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের ভারে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক ব্যাংক এখন খুড়িয়ে চলছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—দুর্বল ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি আগে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও লাফিয়ে বাড়ছে।

বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সুনাম, আস্থা ও ব্যবসায়িক সফলতার কারণে দেশের মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। ঋণ বিতরণ, আমানত সংগ্রহ, ঋণ আদায় ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে ব্যাংকটি এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

তবে গত কয়েক বছরে ব্যাংকটিতে সংঘটিত ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাচার হওয়া এসব অর্থ ফেরত না আসায় এক সময়ের শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক এখন খেলাপি ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়ে গেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও। প্রভিশন সংকটের কারণে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডাররা দীর্ঘদিন ধরে কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছেন না।

অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এখন অনাদায়ী।

এ বিষয়ে মতামত জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ব্যাংকটির বিষয়ে মানারাত ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “ইসলামী ব্যাংক থেকে শুধু এস আলম গ্রুপই নিয়ে গেছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। আরও অনেকে নিয়েছে। এসব টাকা ফেরত না আসায় খেলাপি ঋণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এই অর্থ উদ্ধার সম্ভব নয়।”

ছয় মাসে খেলাপি বেড়েছে ৫৮ হাজার কোটি

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণ ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সে সময় খেলাপি ঋণ ছিল ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৭.৩৮ শতাংশ। সেই হিসাবে মাত্র ছয় মাসে (মার্চ–সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।

নয় মাসে খেলাপি বেড়েছে ৭৩ হাজার কোটি

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, বা ২১.০৮ শতাংশ। সেই হিসেবে নয় মাসে (ডিসেম্বর–সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা।

এক বছরে খেলাপি বৃদ্ধি ৮৮ হাজার কোটি

গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, বা মোট ঋণের ১১ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮৮ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৫২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। যেটা ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত লোনের ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।

এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বিতরণকৃত এসব ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল ৫ হাজার ৪০২ কোটি ২০ লাখ টাকা। যেটা ছিল ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

কয়েক বছরের ব্যবধানে যেখানে খেলাপি ঋণ কয়েক হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা লাখ কোটি টাকারও উপরে উঠে গেছে।

প্রভিশন ঘাটতিও রেকর্ড পর্যায়ে

এক সময়ের শক্তিশালী ব্যাংকটি এখন মন্দ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রভিশনও রাখতে পারছে না। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের একসময়কার সুনাম এখন ইতিহাস। করপোরেট গভর্ন্যান্সে দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি এসব মিলেই ব্যাংকটি গভীর সংকটে পড়েছে। তাদের মতে, জালিয়াতির মাধ্যমে যে অর্থ বেরিয়ে গেছে, তার বড় অংশই আর ফেরত আসবে না। ফলে ব্যাংকটির তারল্য সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এএ