

এক বছরে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, ঝুঁকিতে আমানত ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
ব্যাংক ভিত্তিক প্রভিশন ঘাটতি
উচ্চ খেলাপি ঋণে বিপর্যস্থ ব্যাংক খাত। আর এই খেলাপির কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশন তথা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতিও। ভালো এবং মন্দ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রভিশন তথা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয় ব্যাংকগুলোকে। তবে ঋণ জালিয়াতি এবং অব্যবস্থাপনাসহ নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ যে হারে বাড়ছে, একই হারে পরিচালন মুনাফা না বাড়ায় পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখতে পারছে না সরকারি ও বেসরকারি খাতের ২৪টি ব্যাংক। এই তালিকায় রয়েছে বেশ কিছু সবল ব্যাংকও। আর প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংক দুর্বল হওয়ার সংকেত বহন করে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি না রাখার ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন ব্যাংকের যে অবস্থা তাতে প্রভিশন ঘাটতি হবে। কারণ দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সম্প্রতি খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে গেছে। এখানে শতভাগ প্রভিশন রাখা দরকার। কারণ একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। এভাবে প্রভিশন বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলো আরো দুর্বল হয়ে যাবে। প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে আগে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাছাই-বাছাই করে দিতে হবে, যাতে টাকাগুলো আবার ফেরত আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রভিশন ঘাটতি ছিলো ১০ ব্যাংকের ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এই তালিকায় ১৪টি ব্যাংক যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
তবে কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত প্রভিশনের বেশি সংরক্ষণ করায় দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ঘাটতি ২৫৯ কোটি। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশনে উদ্বৃত্ত ছিলো ৩৮৭ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে অর্থনীতি গবেষক ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম. হেলাল আহমেদ জনি বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, মন্দ ঋণের বিপরীতে যে প্রভিশন রাখতে হয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি যা খেলাপি ঋণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। যদি কোন ব্যাংক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারে তাহলে তাদের ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া উচিত। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়তে দেয়া কোনো অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক মজবুতি অর্জন না হলে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসলে আবারও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য অবশ্যই ব্যাংকগুলোর আরো সতর্ক হতে হবে এবং রেগুলেটরী বডি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার করতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে পরিচালন মুনাফার শূন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ সাধারণ ক্যাটাগরির ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়। নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ সন্দেহজনক খেলাপি ঋণের বিপরীতে রাখতে হয়। এ ছাড়া প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মন্দ বা লোকসান ক্যাটাগরির খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশনিং আলাদা করে রাখার বিধান রয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত। কারণ এটি ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যা মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণের ফল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতিতে প্রথম স্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৮২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতিতে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক। এই সময়ে ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। পঞ্চম অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা।
এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২১ হাজার ৩৮৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ১৯ হাজার ৫১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ হাজার ২৫৭ কোটি, রূপাল ব্যাংকের ১৩ হাজার ৭৪ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ১১ হাজার ৭০৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০ হাজার ৪৮ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৮১ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি, ইউসিবি ব্যাংকের ৪ হাজার ৩০৬ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৬৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১ হাজার ৬৭২ কোটি, এনআরবি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের ১ হাজার ৫৫৫ কোটি, এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৪৯০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক ১ হাজার ১২৫ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৬৩৬ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬১৫ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ২৭০ কোটি, কৃষি ব্যাংকের ২৫৯ কোটি, বিডিবিএলের ৪০ কোটি এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকের ৭ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন ব্যাংকের যে অবস্থা তাতে প্রভিশন ঘাটতি হবে। কারণ দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সম্প্রতি খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে গেছে। এখানে শতভাগ প্রভিশন রাখা দরকার। কারণ একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। এভাবে প্রভিশন বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলো আরো দুর্বল হয়ে যাবে। প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে আগে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাছাই-বাছাই করে দিতে হবে, যাতে টাকাগুলো আবার ফেরত আসে।
এএ