তিন মাসে বন্ধ সাড়ে তিন লাখ জীবন বীমা পলিসি
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-১২-১৭ ২০:৪৩:০৬

রাসেল মাহমুদ: দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানি থেকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) পলিসি তামাদি বা বন্ধ করেছেন ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯০ জন গ্রাহক। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) পলিসি বন্ধ করেছিলেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৬৬ জন গ্রাহক। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে পলিসি বন্ধের হার বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।
আইডিআরএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে সর্বাধিক পলিসি তামাদি হয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের। এ সময় কোম্পানিটির ৬৪ হাজার ৩০৫টি পলিসি বন্ধ হয়েছে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স—এই কোম্পানির পলিসি বন্ধ হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭৪টি। আর ১৯ হাজার ১৮০টি পলিসি বন্ধ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও পলিসি বন্ধের শীর্ষে ছিল সোনালী লাইফ। ওই প্রান্তিকে কোম্পানিটির পলিসি তামাদি হয়েছিল ৭৩ হাজার ২৬৭টি। একই সময়ে ন্যাশনাল লাইফের পলিসি তামাদি হয়েছিল ৪৬ হাজার ৭৬৩টি।
২০২৩ সালে তামাদি হওয়া জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার। আর ২০২৪ সালে পলিসি বন্ধ করেছেন ১২ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৮ জন গ্রাহক।
‘তামাদি’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ—কোনো কিছু বিলুপ্ত হওয়া কিংবা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। বীমা ব্যবসার সঙ্গে ‘তামাদি’ শব্দটি বহুল পরিচিত। পলিসিধারী যদি সময়মতো প্রিমিয়াম পরিশোধ না করেন, তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর পলিসিটি তামাদি বা বন্ধ হয়ে যায়। পলিসি বন্ধ হলে গ্রাহক বীমা কাভারেজ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে জমা দেওয়া অর্থও ফেরত পান না।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে বীমা খাত। তবে নানা কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতটি অনাস্থার মধ্যে নিমজ্জিত। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও পুরোপুরি আস্থা ফিরছে না। উপরন্তু, গোটা খাতে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খলা। এর সঙ্গে বছর বছর পলিসি তামাদি বা বন্ধ হওয়ায় সংকট আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
পলিসি তামাদি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, জীবন বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা (এফএ) পলিসি বিক্রির সময় যতটা মনোযোগী থাকেন, পরবর্তী সময়ে সেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। গ্রাহকদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া অসাধু কিছু বীমা প্রতিনিধির বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে তা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।
বীমা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রদানকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির সাবেক পরিচালক এস. এম. ইব্রাহিম হোসেন এর আগে বলেন, বীমা পলিসি বন্ধ হওয়া কোম্পানি ও গ্রাহক—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। পলিসি বন্ধ হলে গ্রাহক অপ্রত্যাশিত ঘটনার ক্ষেত্রে যে সুরক্ষা পেতেন, তা থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে এটি কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতি ঘটায় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ও গ্রাহক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে আকিজ তাকাফুল লাইফে ২,৯০১টি, আলফা ইসলামী লাইফে ১৫,৮৬৮টি, আস্থা লাইফে ১,২২৫টি, বায়রা লাইফে ১০৯টি, বেঙ্গল ইসলামী লাইফে ৮,০৫৪টি, বেস্ট লাইফে ৯৮৪টি, চার্টার্ড লাইফে ৪,১৭০টি, ডেল্টা লাইফে ২৭,৬০৮টি, ডায়মন্ড লাইফে ৬১০টি, ফারইস্ট ইসলামী লাইফে ৭৭৮টি, গোল্ডেন লাইফে ৩,৮৭২টি, গার্ডিয়ান লাইফে ৬,১৫৪টি, হোমল্যান্ড লাইফে ৩,৬০৮টি, যমুনা লাইফে ১৫১টি, জীবন বীমা করপোরেশনে ৪,১৩৬টি, লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশে (এলআইসিবি) ৫০৩টি, মেঘনা লাইফে ৩,৯৪৭টি, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফে ৪,৪৮৮টি, মেটলাইফ বাংলাদেশে ১৮,৭১২টি, এনআরবি ইসলামী লাইফে ১,৩৮৯টি, পদ্মা ইসলামী লাইফে ৭১৯টি, পপুলার লাইফে ১৩,৪৮৩টি, প্রগতি লাইফে ১৭,২১৯টি, প্রাইম ইসলামী লাইফে ১৯,১৮০টি, প্রগ্রেসিভ লাইফে ২,৯২৬টি, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফে ৭৫৫টি, রূপালী লাইফে ১৭,৬৮৮টি, সন্ধানী লাইফে ১৫,৭৫৭টি, শান্তা লাইফে ৮২টি, সানফ্লাওয়ার লাইফে ২,৪৭৭টি, সানলাইফে ৩৯৬টি, স্বদেশ লাইফে ১৭,০৩৭টি, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফে ৩,৪০০টি এবং জেনিথ ইসলামী লাইফে ৫,০২৫টি পলিসি তামাদি হয়েছে।
একটি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, তামাদি হওয়া পলিসির বেশিরভাগই ক্ষুদ্র বীমা। অনেক গ্রাহক কিছুদিন পর একসঙ্গে টাকা দিয়ে পলিসি চালু করেন। আবার অনেকে কয়েক মাস পর সব বকেয়া পরিশোধ করে পলিসি পুনরায় চালু করেন। এ কারণে পলিসি বাতিল হওয়া নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখের বেশি জীবন বীমা পলিসি বাতিল বা তামাদি হয়েছে। ২০০৯ সালে মোট সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৮৫ লাখ ৮৮ হাজারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তদারকি, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, নিয়মিত গ্রাহক সুরক্ষা ও সহজ সুবিধা চালু না করলে জীবন বীমা খাতে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নির্বাহী সদস্য ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. নুরুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে বীমাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য সরকারের সুনজর যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। পলিসি তামাদি রোধে সবার আগে কোম্পানিকেই উদ্যোগ নিতে হবে। সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ, এজেন্টদের রিনিউয়াল প্রিমিয়াম আদায়ের গুরুত্ব বোঝানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে পলিসি তামাদির হার কমবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা শেখ বলেন, পলিসি তামাদি হলে গ্রাহক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি কোম্পানিও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই পলিসি তামাদির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে বীমা এজেন্টরা নতুন পলিসি বিক্রিতে যতটা মনোযোগী থাকেন, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে প্রিমিয়াম আদায়ে ততটা মনোযোগ দেন না। এর অন্যতম কারণ কমিশন কাঠামো। প্রথম বর্ষে কমিশন থাকলেও পরবর্তী বর্ষগুলোতে সেই সুযোগ থাকে না। ফলে পুরোনো পলিসির ধারাবাহিকতা রক্ষার বদলে তারা নতুন পলিসি বিক্রিতে বেশি মনোযোগী হন। এই ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহককেও বোঝাতে হবে—পলিসি বন্ধ হলে তার কী ক্ষতি হচ্ছে। অনেক সময় এজেন্টের প্ররোচনায় বা পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই গ্রাহক পলিসি নেন। কোম্পানির পক্ষ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয় না।
ড. হাসিনা শেখ বলেন, এসব বিষয়ে যদি কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে তামাদি পলিসির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












