ড. ফাহমিদা খাতুন

ব্যাংক খাত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৫-১২-১৮ ১৮:৫০:২৪


আমরা একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বাংলাদেশে একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে এবং আগামীতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সবাই আমরা লক্ষ্য করেছি যে কিভাবে ব্যাংক খাতটাকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা হয়েছে এবং আগামী নির্বাচনে যেই দলগুলো ক্ষমতায় আসবে তাদেরকে এই ব্যাপারে একটা পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত অডিটরিয়ামে ‘ব্যাংকিং সেক্টরের সংস্কার চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা এসেছে। আমার কাছে মনে হয় যে এটা একটা সর্বোত্তম সময় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছেন এবং তারা তাদের নির্বাচনি ম্যানিফেস্টো দেবেন আমরা সেদিকে তাকিয়ে আছি। তারা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ব্যাংকিং খাতকে কিভাবে সুশৃঙ্খল শক্তিশালী খাত হিসাবে পরিণত করবেন সেটার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং সুনির্দিষ্ট কমিটমেন্ট থাকতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সেটা না থাকলে আসলে তারা কিভাবে অর্থনৈতিক নীতিমালাগুলি প্রণয়ন করবেন? তাদের অর্থনৈতিক সংস্কার গুলো কি হবে? সেগুলো কিন্তু পরিষ্কারভাবে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে আমরা অতীতে দেখেছি যে প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী এমনকি রাজনৈতিকভাবে নীতি নির্ধারক যারা তারাও যেভাবে ব্যাংকিং খাতকে ব্যবহার করে শুষে নিয়ে তাদের নিজেদের পকেট ভারি করেছেন সেইটা আর যাতে ফেরত না আসে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা কি এক সেট দৌরাত্ম্যপূর্ণ পুঁজিপতি থেকে আরেক সেট দৌরাত্ম্যপূর্ণ পুঁজিপতি তৈরি করবেন ব্যাংকিং সেক্টরের মাধ্যমে। নাকি জনগণের কল্যাণে, ব্যক্তি খাতের উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাতকে ব্যবহার করবেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটা হাতিয়ার হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যবহার করবেন নাকি ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের পুঁজি যোগানের জন্য ব্যবহার করবেন। এটা তাদের পরিষ্কার করে বলতে হবে। যাতে নির্বাচনের পরে জনগণ তাদেরকে দায়ী করতে পারে যে তারা কথার সাথে কতখানি মিল রাখতে পেরেছে।

তিনি আরও বলেন, দিনের শেষে আসলে অর্থনীতিটা কি? অর্থনীতির একটা রাজনৈতিক সত্ত্বাও রয়েছে। যে কোন নীতির অর্থনৈতিক নীতি দিনের শেষে রাজনৈতিক অর্থনীতি হয়ে যায়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত না শুধু, বিদ্যুৎ খাত বলি বা প্রকল্প বাস্তবায়ন বলি এমনকি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা নীতি এবং তার বাস্তবায়ন রাজনৈতিক অর্থনীতির কবলের মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের ভূমিকা ও ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর আস্তে আস্তে যে একটা উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে উঠলো সেটার পেছনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুঁজির উৎস যেটা যোগায় সেটা তো ব্যাংকিং খাত থেকেই আসে। আপনাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখবেন যে, বাংলাদেশের যে উদ্যোগক্তা শ্রেণী তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোই তাদেরকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে তাদেরকে গড়ে তুলেছে।

ফাহমিদা খাতুন জানান, সেইরকম একটা ভূমিকায় যে খাতটা ছিল সেই খাতটা আস্তে আস্তে এই ৫০ বছর পরে এসে এরকম একটা জঞ্জালপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। সেটা কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। কারণ আমাদের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। সেই অনুযায়ী যেহেতু আমাদের আর্থিক খাতের গভীরতাটা অনেক কম সেখানে এই ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা বেশি। ব্যাংকিং খাতকে নির্ভর করেই (অর্থনীতি) এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

ব্যাংকিং খাতের ভূমিকাটাই মূলত আর্থিক খাতের মূল উৎস উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই খাতে যখন কোন সমস্যা সৃষ্টি হয় সেটা কিন্তু শুধুমাত্র ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা না পুরো অর্থনীতির উপর একটা প্রভাব পড়ে। ভালো হলে সেটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং খারাপ হলে সেটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সেটার প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছি ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরে।

তিনি বলেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে অর্থনীতিটা পেয়েছে সেখানে তো আমরা দেখেছি যে, অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই একটা দুর্বল অবস্থানে ছিল। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত অন্যতম একটা দুর্বলতম জায়গায় ছিল সেখান থেকে অনেক ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংস্কার কর্মসূচি বলি কিংবা বিভিন্ন ধরনের নীতিমালার কথা বলি সেটা দৃশ্যমান হয়েছে শুধু আর্থিক খাতে এবং বিশেষভাবে বলতে গেলে ব্যাংকিং খাতে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার যেগুলো হয়েছে সেগুলোর কিছু কিছু ফলাফল দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যেই। সংস্কার যেহেতু একটা চলমান প্রক্রিয়া, সংস্কারের ফলাফল পেতে অনেক দেরি হয়। ভবিষ্যতে যদি সংস্কার চলমান থাকে তাহলে আমরা ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিএইচ