গৃহবধু থেকে ‘ম্যাজিকেল নেত্রী’ খালেদা জিয়া
সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-১২-৩০ ০৯:৫৯:৩৭

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক ব্যতিক্রমী নাম। কোনো ছাত্ররাজনীতি, সরাসরি গণআন্দোলন কিংবা প্রথাগত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই একজন সাধারণ গৃহবধু থেকে তিনি উঠে এসেছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে। এই রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাসের বাঁকবদল এবং এক নারীর দৃঢ় মনোবলের প্রতিফলন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানকে অনেকেই ‘ম্যাজিকেল’ বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ তিনি রাজনীতিতে আসেন প্রস্তুত কোনো ক্যারিয়ার নিয়ে নয়, বরং ইতিহাসের নিষ্ঠুর বাস্তবতা, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের হাত ধরে। গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়ক—এই যাত্রা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নারী নেতৃত্বে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিচ্ছেদ্য নাম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের অন্যতম পথিকৃৎ। মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন।
নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনাই করেননি, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং নারী নেতৃত্বের ধারণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
গৃহিণী জীবনের শুরু
খালেদা জিয়া মূলত ছিলেন একজন গৃহবধু। ১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর জীবন আবর্তিত হয়েছে সংসার, সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্বকে কেন্দ্র করে। স্বামীর চাকরির কারণে তাঁকে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে বসবাস করতে হয়েছে। এই সময় তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল—একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী।
সে সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক সভা, বক্তব্য বা কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায়নি। নিরবে, আড়ালে থেকে সংসার ও পরিবারই ছিল তাঁর একমাত্র জগৎ। কিন্তু এই নীরব জীবনই ধীরে ধীরে তাঁকে প্রস্তুত করে তুলছিল ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতার জন্য।
১৯৭১: বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
মহান মুক্তিযুদ্ধ খালেদা জিয়ার জীবনে এক গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। একজন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে তিনি যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হন। যুদ্ধের সময় পরিবার রক্ষা, সন্তানদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়েই তাঁর মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে।
যদিও তিনি তখনো রাজনীতিতে সক্রিয় হননি, তবে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও দেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষা পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৮১: জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়
খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় ও নির্মম মোড় আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। স্বামী হত্যার মধ্য দিয়ে হঠাৎ করেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়ে। একজন গৃহবধু থেকে তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও পরিবারের অভিভাবক।
এই সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষার প্রতীক হিসেবে ধীরে ধীরে খালেদা জিয়ার নাম সামনে আসতে থাকে। যদিও প্রথমদিকে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তবুও পরিস্থিতি ও দলের চাপ তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে আসে।
রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ
১৯৮১ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। দলের পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের প্রশ্নে খালেদা জিয়াকে সামনে আনা হয়। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন এবং একই বছর ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এর মধ্যেই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র দ্রুত গড়ে উঠতে শুরু করে।
নেতৃত্বে উত্থান ও আপসহীনতা
১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এই সময় থেকেই খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন রাজপথের নেত্রী। স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। গ্রেপ্তার, নির্যাতন, রাজনৈতিক চাপ—সবকিছু মোকাবিলা করেই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন দৃঢ় ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে একজন গৃহবধু থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আরও দুইবার সরকার গঠন করেন।
তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনীতির চর্চা এবং অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নারী নেতৃত্বের প্রতীক
খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক। দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে তিনি প্রমাণ করেছেন—নারীরাও রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম ও দৃঢ় হতে পারেন।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা কোনো পরিকল্পিত পথচলা ছিল না। ইতিহাস, ব্যক্তিগত বেদনা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে এই পথে নিয়ে এসেছে। গৃহবধু থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে ওঠার এই যাত্রা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী, প্রভাবশালী ও স্মরণীয় নারী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর জীবনগাথা শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়—এটি এক নারীর অদম্য সাহস ও সময়ের দাবিতে নিজেকে বদলে নেওয়ার অনন্য গল্প।







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













