আপসহীন নেত্রীর পেছনের গল্প কী?

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৫-১২-৩০ ০৯:৫৮:৩০


বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়াকে কেন ‘আপসহীন নেত্রী’ বলা হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলন-সংগ্রাম, সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা ও ক্ষমতার বাইরে থেকেও নীতিগত অবস্থানে অনড় থাকার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হয়। ‘আপসহীন’ শব্দটি তাঁর ক্ষেত্রে কোনো আবেগী বিশেষণ নয়; বরং এটি গড়ে উঠেছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক আচরণ ও অবস্থানের ধারাবাহিকতায়।

চলুন তাহলে জানি কিভাবে আপসহী নেত্রী হয়ে উঠলেন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অনড় অবস্থান
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত, তখন তিনি বিএনপির নেতৃত্বে রাজপথে সরব অবস্থান নেন। আন্দোলনের নানা পর্যায়ে আপসের প্রস্তাব এলেও তিনি স্বৈরশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় না গিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পেছনে তাঁর এই অনড় অবস্থান বড় ভূমিকা রাখে।

ক্ষমতায় থেকেও নীতিগত দৃঢ়তা
১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি নিজেকে আপসহীন রাজনীতির ধারায় রেখেছেন—এমনটাই তাঁর সমর্থকদের দাবি। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসার সিদ্ধান্তে তিনি রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে দৃঢ় অবস্থান নেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে দলীয় ও আদর্শিক অবস্থানকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যা তাঁকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত করেছে।

১৯৯৬ সালের সংকট ও আন্দোলন
১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে যখন রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছাড়ার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির চাপে নির্বাচন আয়োজন ও ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে, তবে এই সময় তাঁর অনড় রাজনৈতিক অবস্থান ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তিকে আরও দৃঢ় করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে ভূমিকা
২০০৬–২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রক্ষা ও নির্বাচনী নিরপেক্ষতার দাবিতে তিনি যে অবস্থান নেন, সেটিও তাঁর আপসহীনতার বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। একাধিকবার সংলাপ ও সমঝোতার প্রস্তাব এলেও তিনি নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নে আপস করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল—গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা হতে পারে না।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও আপসহীন
খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ে। মামলা, কারাবরণ, রাজনৈতিক চাপ ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অবস্থান বদলাননি। বিশেষ করে কারাবন্দি অবস্থায় কিংবা গুরুতর অসুস্থতার সময়ও তিনি রাজনৈতিক সমঝোতার বিনিময়ে সুবিধা নেওয়ার পথে যাননি।

ব্যক্তি জীবন ও রাজনৈতিক চরিত্র
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে প্রভাবিত করেছে। স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যার পর তিনি হঠাৎ করেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সেই সময় তিনি নীরবে সরে না গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ধীরে ধীরে দলীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। এই সংগ্রামী জীবন তাঁকে সিদ্ধান্তে দৃঢ় ও আপসহীন করে তোলে।

সব মিলিয়ে, বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন নেত্রী’ বলা হয় কারণ তিনি ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন—গণতন্ত্র, দলীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে বারবার আপস প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নির্বাচন, সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে তাঁর অনড় অবস্থানই তাঁকে এই বিশেষণে পরিচিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই আপসহীনতা তাঁকে যেমন প্রশংসিত করেছে, তেমনি বিতর্কের কেন্দ্রেও রেখেছে। তবুও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই—‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।