নভেম্বরে হোঁচট খেল সঞ্চয়পত্র বিক্রি

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০১-১৪ ১৯:১০:৫৭


  • নভেম্বরে (নেতিবাচক) ২৯৩ কোটি টাকা
  • জুলাই-নভেম্বর (ইতিবাচক) ২০৭৬ কোটি টাকা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ইতিবাচক ধারা দেখা গেলেও অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরে এসে সেই ধারায় হোঁচট লেগেছে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মানুষ সঞ্চয়পত্র ভাঙার চেয়ে বেশি কিনলেও নভেম্বরে কেনার চেয়ে বেশি ভেঙেছে। ফলে একক মাস হিসেবে নভেম্বরে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি আবারও নেতিবাচক ধারায় ফিরে গেছে। আগের অর্থবছরের নভেম্বরেও একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ২৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। অর্থাৎ, নভেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ২৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়েও সঞ্চয়পত্র বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। ওই সময়ে বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল।

আগের চার মাসে ছিল ইতিবাচক ধারা

নভেম্বরের এই পতনের আগে চলতি অর্থবছরের চার মাস সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে স্বস্তির চিত্র দেখা গিয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে আগের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের তুলনায় ৪২৪ কোটি টাকা বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। এর আগের মাস, অর্থাৎ তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে বিক্রি বেশি ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় মাস আগস্টে এই পরিমাণ ছিল ২৭৮ কোটি টাকা। আর অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের তুলনায় সবচেয়ে বেশি, ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।
এই চার মাসের ইতিবাচক ধারাই অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রকে এখনো ভারসাম্যপূর্ণ রেখেছে।

পাঁচ মাসে এখনো ইতিবাচক, তবে চাপ বাড়ছে

একক মাস হিসেবে নভেম্বরে বিক্রির ধারা নেতিবাচক হলেও পুরো অর্থবছরের পাঁচ মাসে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি এখনো ইতিবাচক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আগের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের তুলনায় ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।

তবে এই ইতিবাচক প্রবণতা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় খুব বেশি শক্তিশালী নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতিবাচক থাকলেও ওই সময় আগের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের তুলনায় বেশি বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা।

দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে নেতিবাচক বাস্তবতা

মাসভিত্তিক বা কয়েক মাসের হিসাবের বাইরে তাকালে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের দীর্ঘমেয়াদি চিত্র বেশ চাপের। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল নেতিবাচক। ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল।

এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। ওই অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় আগের আসল ও সুদ বাবদ ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

কেন কমছে আগ্রহ

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই ওঠানামার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ব্যাংক খাতে আমানতের সুদের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে, ফলে অনেক গ্রাহক সঞ্চয়পত্রের বদলে ব্যাংক আমানতে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সঞ্চয়পত্র ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, সরকারও অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ কমাতে সঞ্চয়পত্র নির্ভরতা কমানোর নীতিতে রয়েছে।

সামনে কী

বিশ্লেষকদের মতে, সামনের মাসগুলোতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ধারা অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক সুদের হার এবং সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের ওপর। নভেম্বরে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পুরো অর্থবছরের শেষে নিট বিক্রি আবারও ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এএ