

>> আমদানি বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে: মুখপাত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক
>> বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে: হেলাল আহমেদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক
কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিক কমছে রপ্তানি আয়। বিপরীতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। আমদানি ও রপ্তানির বিপরীতমুখী এ প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় বাড়ছে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি।
বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭৯৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছেন ২ হাজার ৭৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য আমদানি হয়েছিল ২ হাজার ৬০১ কোটি ডলারের পণ্য।
অন্যদিকে একই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৮১৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ১ হাজার ৮০৭ কোটি ডলার।
আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানের কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে ৯৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৯ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৫ কোটি (২০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন) ডলারে নেমেছিল। তার আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি ডলার।
এ বিষয়ে কথা বললে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার পেছনে রপ্তানি আয়ও কাজ করে। ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে আগামী নির্বাচনের পর রপ্তানি আয় আগের জায়গায় চলে আসবে বলে আমরা আশা করি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খুব ভালো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় রপ্তানি আয় কমাটা একেবারে অস্বাভাবিক না। নির্বাচিত সরকার আসার পর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
এছাড়া, চলতি অর্থবছরে একক মাস হিসাবেও নভেম্বরে বেড়েছে ঘাটতি। জুলাই-আগস্ট দুই মাসে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তিন মাস শেষে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭১ কোটি ২০ লাখ ডলারে। চার মাস শেষে (জুলাই-অক্টোবর) ঘাটতি ছিল ৭৫৭ কোটি ডলার।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের প্রধান উৎস রপ্তানি আয়ও টানা কমছে। আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পাঁচ মাস ধরেই রপ্তানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবেই রপ্তানি বাণিজ্যে এই নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতেও এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ও গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯৬ কোটি ৮৩ লাখ (৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন) ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই মাস ডিসেম্বরের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন) ডলার।
রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ধস নামার কারণেই সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণত অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম ধরা হয়। তবে চলতি অর্থবছরে সেই সময়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।
এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ডলার। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৮ কোটি ডলার। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৫৬ কোটি ডলার। সে হিসেবে বেড়েছে ১৩ কোটি ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো দেশের পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আয় এবং রেমিট্যান্সের মতো চলতি হস্তান্তরের সমষ্টি। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ সাধারণত চলতি হিসাবকে সুরক্ষা দেয়। তবে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এই ভারসাম্যকে নেতিবাচক দিকে ঠেলে দেয়।
এদিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবে ১২৩ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এখানে ১০১ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল।
বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, সামনে রমজান মাস আসছে। কিছু পণ্য আছে যেগুলো রোজা নির্ভর। ওই পণ্যগুলো এখন বেশি আমদানি হচ্ছে। আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে আমদানি বাড়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
এএ