

কল্যাণমুখী অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সুকুক’ বা শরিয়াহভিত্তিক বন্ড বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে রূপান্তর এবং প্রচলিত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে এই ইসলামি বিনিয়োগ পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ এখন শরিয়াহভিত্তিক হওয়ায় আধুনিক এই আর্থিক উপকরণটি একদিকে যেমন অলস তারল্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের বিকল্প হিসেবে দেশকে স্বনির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম।
সম্প্রতি ইসলামি অর্থায়নের আওতায় সরকারের নতুন উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সুকুক–১’ ইস্যুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইজারা পদ্ধতিতে ইস্যু হতে যাওয়া এই সুকুক সদ্য কার্যক্রম শুরু করা ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-এর অনুকূলে ইস্যু করা হচ্ছে। সুকুকটির মোট মূল্যমান ১০ হাজার কোটি টাকা, মেয়াদ ১০ বছর এবং বার্ষিক প্রাক্কলিত মুনাফার হার ৯.৭৫ শতাংশ। এটি নবগঠিত এই ব্যাংকের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ উদ্যোগ। সরকারি কর্মচারীদের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মিত সাতটি আবাসন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কিছু সেবায় এই সুকুকের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এর ইস্যু কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, দেশের ইসলামি ব্যাংকগুলোর কাছে যে অতিরিক্ত অর্থ অনেক সময় অলস অবস্থায় থাকে, এই সুকুক সেই অর্থ নিরাপদ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে চড়া সুদে বাণিজ্যিক ঋণ নিতে হবে না; বরং ইসলামিক ফাইন্যান্স পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী অর্থায়ন সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, বাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ সুকুকের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে স্থানান্তরিত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। চতুর্থত, এই ১০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
‘সুকুক’ শব্দটি মূলত বহুবচন, এর একবচন ‘ছক্ক’। শব্দটির উৎপত্তি ফার্সি থেকে, পরবর্তীতে আরবি ‘ছাক্কুন’ রূপে ব্যবহৃত হয় এবং এর বহুবচন হিসেবে ‘সুকুক’ প্রচলিত। এর শাব্দিক অর্থ হলো সার্টিফিকেট বা দলিল—যা কোনো সম্পদের মালিকানা বা অধিকারকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন জমির দলিল। সুকুক একটি সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন পণ্য, যেখানে প্রচলিত বন্ডের মতো সুদের কোনো ব্যবহার নেই। সুকুক ক্রয় মানে সুদে ঋণ প্রদান নয়; বরং নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পে অংশগ্রহণ। এই অংশগ্রহণ মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা বা সালামের মতো শরিয়াহসম্মত চুক্তির আওতায় সম্পন্ন হয়।
যেকোনো বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সরকার পরিচালনার জন্য বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হয়। সরকার যখন সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়, তখনও বিশাল অংকের অর্থায়ন দরকার হয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় এ অর্থ সংগ্রহ করা হয় শেয়ার বা সুদভিত্তিক বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে। সুকুক হলো ঠিক তেমনই বৃহৎ তহবিল সংগ্রহের একটি শরিয়াহসম্মত বিকল্প পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সরকার বা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত সম্পদভিত্তিক মুনাফা অর্জন করেন।
সুকুক ইস্যু প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিনটি পক্ষ জড়িত থাকে—ইস্যুকারী (সরকার বা প্রতিষ্ঠান), বিনিয়োগকারী এবং একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, যাকে বলা হয় স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল (এসপিভি)। প্রথমে একটি বাস্তব সম্পদ বা প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়। বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিয়ে সেই সম্পদ নির্মাণ বা ক্রয় করা হয় এবং সম্পদ থেকে অর্জিত ভাড়া বা মুনাফা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সম্পদটি পুনরায় ক্রয় করে এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধন ফেরত পান।
প্রচলিত বন্ড ও সুকুকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারী একজন পাওনাদার, কিন্তু সুকুকে বিনিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট সম্পদের একজন মালিক বা অংশীদার। বন্ডের আয় নির্ধারিত সুদনির্ভর, যা লাভ-ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; অপরদিকে সুকুকের আয় সম্পদের ভাড়া বা প্রকৃত ব্যবসায়িক মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া সুকুক কেবল শরিয়াহসম্মত খাতেই বিনিয়োগযোগ্য।
আধুনিক সুকুকের যাত্রা শুরু হয় সত্তরের দশকে এবং ১৯৯০ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম করপোরেট সুকুক ইস্যু হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বৈশ্বিক সুকুক বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি যুক্তরাজ্য ও হংকংয়ের মতো অমুসলিম দেশও বড় অংকের সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে অবকাঠামো অর্থায়নে সফলতা অর্জন করেছে।
আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বৈশ্বিক সুকুক বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৮৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬ সালের মধ্যে এটি ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে। বাংলাদেশে ২০২০ সালে প্রথম সুকুক ইস্যুর পর শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতে আরও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়া হয়েছে, যেখানে চাহিদার তুলনায় ৪–৫ গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছে।
অবকাঠামো খাতে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যখন অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, তখন সুকুক একটি কার্যকর ও টেকসই বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এর বিকাশে পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর অভাব, সেকেন্ডারি মার্কেটের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, সুকুক বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আর্থিক পণ্য নয়; বরং এটি টেকসই উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও শরিয়াহসম্মত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুকুক বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী অর্থনীতির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে।
লেখক: মোঃ খায়রুল হাসান, সিএসএএ
ব্যাংকার, আর্থিক যোগাযোগবিদ ও ইসলামি অর্থায়ণ বিশ্লেষক।