জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বড় ছাড়
প্রকাশ: ২০২৬-০১-২১ ১৭:৩৯:৩৯

- বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা
- ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে
- গ্রেস পিরিয়ডে শুধু সুদ পরিশোধের সুবিধা
- ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত শ্রেণিকৃত ঋণ পুনঃতফসিলে মোট ঋণের ওপর মাত্র ৩ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে
রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে সহায়তা দিতে ঋণ পুনঃতফসিলে বড় ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই খাতের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইউরোপের সামরিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে শিল্পগুলোর নগদ প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবেদন করা যাবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত।
গতকাল (মঙ্গলবার) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত যেসব ঋণ শ্রেণিকৃত হয়েছে, সেগুলো পুনঃতফসিল করতে হলে মোট ঋণের ওপর ৩ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে। এর মধ্যে ১.৫ শতাংশ আবেদনকালে এবং বাকি ১.৫ শতাংশ পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। আগে ২০২৩ সালের সার্কুলারের আওতায় যেসব ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে নতুন করে পুনর্গঠন করতে চাইলে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিলেই হবে এবং সর্বোচ্চ আরও দুই বছর সময় যোগ করা যাবে।
গ্রেস পিরিয়ডের সময় গ্রাহককে মূল ঋণের ওপর ধার্য সুদ মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে। আগের বকেয়া সুদ আলাদা ব্লকড হিসাবে রাখা হবে এবং গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর সেই সুদ সুদবিহীন কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকবে। পুরো ঋণের কিস্তিও মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে, আর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ আবার নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হবে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ব্যবসা ও রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখতে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠিত ঋণ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ নিতে পারবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তবে জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
গ্রাহকরা আগামী ৩০ জুন ২০২৬ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংককে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন ও বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা বিবেচনায় জাহাজ নির্মাণ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই এই শিল্পকে সচল রাখা এবং একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
শিল্পখাতের বর্তমান সংকট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইউক্রেন যুদ্ধকেন্দ্রিক ইউরোপের সামরিক অস্থিরতা এবং কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প বড় চাপের মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন করতে না পারায় অর্থপ্রবাহে সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর।
খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তাদের মতে, দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড ও কম ডাউন পেমেন্ট শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিনির্ভর, তারা নতুন অর্ডার সংগ্রহ ও উৎপাদন স্বাভাবিক করতে কিছুটা সময় পাবে।
ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টিভঙ্গি
ব্যাংকারদের মতে, পুনঃতফসিল সুবিধা একদিকে শিল্পকে সহায়তা করবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে। তবে তারা বলছেন, যথাযথ যাচাই ছাড়া পুনঃতফসিল করলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়তে পারে, এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ।
আগের নীতির সঙ্গে পার্থক্য
২০২৩ সালের সার্কুলারের তুলনায় নতুন নির্দেশনায় গ্রেস পিরিয়ড ও মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে এবং ডাউন পেমেন্টের হারও তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে সংকটগ্রস্ত শিল্পকে বাড়তি সময় দিতে চাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে উৎপাদন অব্যাহত থাকবে, কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে এবং মধ্যমেয়াদে রপ্তানি আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।
ঝুঁকি ও সতর্কতা
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পুনঃতফসিল যেন নিয়মিত সুবিধায় পরিণত না হয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বাইরে রাখার বিষয়টি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হলে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা দুর্বল হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এই বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পটির টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













