

মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটেই নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—এই পাঁচ কৃষি পণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি পণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাও এর পেছনে বিরাট ভূমিকা রাখছে বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে কৃষক ন্যায্য দাম না পেলেও ভোক্তাকে বাড়তি মূল্য গুনতে হচ্ছে।
গতকাল (বুধবার) বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ভ্যালু চেইন এফিসিয়েন্সি অফ এগ্রিকালচারাল প্রডাক্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় কৃষিপণ্যগুলোর উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বৃদ্ধির কাঠামো বিশ্লেষণ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গবেষণা দলের প্রধান ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন।
গবেষণার পদ্ধতি ও পরিসর
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গবেষণাটি দুটি ধাপে পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি ছিল প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ ছিল একই বছরের ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই। এ সময় ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলায় ‘পারপাসিভ র্যান্ডম স্যাম্পলিং’ পদ্ধতিতে ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আগস্টে গবেষণা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
চালের বাজার: মিলারনির্ভর মূল্য কাঠামো
গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ ৮৭২ টাকা হলেও বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২৫ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। এতে কৃষকের মুনাফা থাকলেও চালের বাজার পুরোপুরি মিলারনির্ভর। প্রতি কেজি চাল কৃষক পর্যায়ে দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায়। মিলাররা চালের পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করছেন, যা ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়াচ্ছে।
আলুর দাম বাড়ার প্রধান কারণ: কোল্ড স্টোরেজ
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আলুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার পর্যায়ে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হলেও কৃষক বিক্রি করেন ১৮ টাকা ৪৪ পয়সায়। হিমাগার থেকে বের হতে দাম দাঁড়ায় ২৮ টাকা ৮০ পয়সা এবং খুচরা বাজারে তা বেড়ে ৪৫ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায়। কোল্ড স্টোরেজ গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফাই আলুর দাম বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় হিমাগারের কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া কমানোর সুযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পেঁয়াজ: সংরক্ষণ সংকট ও ওজন হ্রাস
পেঁয়াজের দামের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ওজন হ্রাসকে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ ১৯ টাকা ২৪ পয়সা হলেও কৃষক বিক্রি করেন ৪৬ টাকা ৯৪ পয়সায়। খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ৮০ টাকা ৭৫ পয়সায়। দীর্ঘদিন বাড়িতে সংরক্ষণে প্রতি মণ পেঁয়াজে প্রায় ১২ কেজি ওজন কমে যায়। ফলে অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় ওঠার আশঙ্কা থাকে। তবে গবেষণায় পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রয়লার মুরগি: ঝুঁকি বেশি, লাভ কম
ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খামারিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি নিলেও মুনাফা খুবই সীমিত। উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৬৩ টাকা ৫৩ পয়সা হলেও খামারিরা বিক্রি করেন ১৭২ টাকা ১৮ পয়সায়। খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ১৯৫ টাকা ৩৩ পয়সায়। খাবারের খরচই মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ। জরিপের সময় অনেক খামারি প্রতি কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত লোকসান করেছেন।
ডিম উৎপাদন: ছোট খামারি বনাম কর্পোরেট বাস্তবতা
ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৯ টাকা ৪৭ পয়সা হলেও খামারি বিক্রি করেন ১০ টাকা ২৬ পয়সায়। খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ১১ টাকা ৭৭ পয়সায়। ডিম উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৮৫ শতাংশই যায় খাবারের পেছনে। ছোট খামারিরা অফ-সিজনে লোকসানে পড়লেও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকের অভিজ্ঞতা
বগুড়ার এক আলু চাষি জানান, হিমাগারের ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক সময় উৎপাদন খরচ উঠলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, “আলু সংরক্ষণ করতে না পারলে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়।”
ভোক্তার প্রতিক্রিয়া
ঢাকার এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী বলেন, “একই পণ্যের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এত বাড়ে যে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কৃষক যদি লাভ না পায়, তাহলে দাম এত বাড়ে কেন—সেটাই প্রশ্ন।”
মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা
গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে ফড়িয়া, আড়তদার, পাইকার, পরিবহনকারী ও মিলার—একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় প্রতিটি ধাপে দাম বাড়ছে। কার্যকর নজরদারির অভাবে এই স্তরগুলোতেই বড় মুনাফা জমা হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গবেষণার সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মত
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, সরাসরি কৃষক–ভোক্তা সংযোগ এবং কন্ট্রাক্ট ফার্মিং চালু করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো সম্ভব।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, আসন্ন উৎসব মৌসুম ও রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে চাপ বাড়তে পারে। সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে মূল্য অস্থিরতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে সুপারিশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় কৃষি পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। তা হলো— আলু ও পেঁয়াজের জন্য উন্নত ও বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা কার্যকর বাস্তবায়ন, ফিডের দাম নিয়মিত মনিটরিং, ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল চালু করা।
এএ