ইসলামি ব্যাংকিংয়ে ফিরছে গ্রাহকের আস্থা বাড়ছে আমানত

::জাহাঙ্গির আলম আনসারী আপডেট: ২০২৬-০১-২৩ ১৯:৫৩:৪২


  • এক বছরে আমানত বেড়েছে ৪১৭৭৭ কোটি টাকা
  • এক মাসে আমানত বেড়েছে ৯৪৯৯ কোটি টাকা

>> ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা ফিরেছে: ওমর ফারুক খান, এমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ
>> ইসলামি ব্যাংকিংয়ে দিন দিন মানুষের আস্থা আরও বাড়বে: মুখপাত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক একেবারে ধসে পড়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে চরম তারল্য সংকটের কারণে সরকার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারণে মানুষের আস্থাও উঠে গিয়েছিল ব্যাংক খাত থেকে। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে মানুষের আস্থা আবার ফিরতে শুরু করছে ব্যাংক খাতে। হাতে রাখা টাকাও আবার ব্যাংকে জমা রাখছে।

আমানতে ইতিবাচক প্রবণতা

এদিকে কয়েকটি ব্যাংক, ভালো ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর অবস্থা ভালো থাকায় ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাড়ছে আমানতের স্থিতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের তুলনায় নভেম্বর মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর আমানত বেড়েছে ২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে এগুলোর আমানত বেড়েছে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ।

এ বিষয়ে কথা বললে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ওমর ফারুক খান বলেন, ব্যাংক খাতে কিছু সমস্যা হওয়ার কারণে মানুষের আস্থায় কিছুটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেটা এখন দূর হচ্ছে। শুধু ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা নয়, পুরো ব্যাংক খাতের ওপরই মানুষের আস্থা ফিরে আসছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঠিক পদক্ষেপের কারণে।

তিনি বলেন, গত বছর শুধু আমাদের ব্যাংকেই ২৫ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংক মার্জার করার ফলে মানুষের আস্থা বাড়ছে। ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন ফিরছে। ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকাও ফিরছে ব্যাংকে। আমরা আশা করি, এটা অব্যাহত থাকবে এবং দিন দিন আরও বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর আমানত ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। আর পরের মাস নভেম্বরে এগুলোর আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা।

সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর আমানত বেড়েছে ৯ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা, বা ২ দশমিক ০৩ শতাংশ।

আর ২০২৪ সালের একই সময়ে (নভেম্বরে) ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত বেড়েছে ৪১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা, বা ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ।

ঢাকার মিরপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “একসময় ব্যাংক থেকে টাকা তুলতেই ভয় লাগত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নিয়মিত হিসাব খুলছি, আবার ডিপোজিটও করছি।”

অন্যদিকে, কুমিল্লার এক প্রবাসী পরিবারের সদস্য জানান, “আগে হুন্ডিতে টাকা পাঠানোর কথা ভাবতাম। এখন ব্যাংকের ওপর ভরসা ফিরে আসায় সরাসরি ইসলামি ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছি।”

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত পরিস্থিতি

তথ্য মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানত ছিল ৪ লাখ ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। আর পরের মাস নভেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

সেই হিসাবে এক মাসে ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ।

প্রবাসী আয় বৃদ্ধি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬৯ কোটি ডলার। আর পরের নভেম্বর মাসে এগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৭৪ কোটি ডলার।

সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় বেশি এসেছে ৫ কোটি ডলার বা ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

আমদানি বিল পরিশোধ বেড়েছে

তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামি ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছিল ১০৩ কোটি ডলার। আর পরের মাস নভেম্বরে এগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১০৪ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর আমদানি বিল পরিশোধ বেড়েছে ১ কোটি ডলার।

রপ্তানি আয় কমেছে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আসা রপ্তানি আয় কমেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছিল ৭৫ কোটি ডলার। আর পরের নভেম্বরে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৬৬ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় কমেছে ৯ কোটি ডলার।

যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক

এ বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংকে কিছু সমস্যা হওয়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পেত। পাঁচটি ব্যাংককে নিয়ে এখন সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক হওয়ার পর মানুষের সেই ভয়টা কেটে গেছে। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা আবার ফিরে এসেছে। এজন্য ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশ্লেষকদের মতে, আমানত বৃদ্ধির এই ধারা আশাব্যঞ্জক হলেও খেলাপি ঋণ, রপ্তানি আয় হ্রাস এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সংস্কার কার্যক্রম থেমে গেলে আস্থার এই পুনরুদ্ধার টেকসই নাও হতে পারে।

তবে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা আগামী দিনে দেশের ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতার একটি শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এএ