বিএসইসির নির্দেশনা উপেক্ষিত
অবন্টিত লভ্যাংশ নিয়ে কোম্পানিগুলোর গড়িমসি
::জাকির হোসাইন আপডেট: ২০২৬-০১-২৬ ১৭:২৬:৫৫

অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্দেশনা মানছে না পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণ না করে তা বছরের পর বছর রেখে দিয়েছে। এতে একদিকে যেমন প্রাপ্য বিনিয়োগকারী তার লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য। তাই এটি বিনিয়োগকারীদেরকেই ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। তা সম্ভব না হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এর সমাধান করতে হবে।
কীভাবে অদাবিকৃত লভ্যাংশ তৈরি হয়
কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ ঘোষণার পর বিভিন্ন কারণে একটি অংশ অদাবিকৃত থেকে যায়। অর্থাৎ অনেক বিনিয়োগকারী তার প্রাপ্য লভ্যাংশ নেন না। এটিকেই অদাবিকৃত লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিধি অনুযায়ী এই লভ্যাংশ কোম্পানিগুলো তার অধীনে তিন বছর পর্যন্ত নিজেদের কাছে রাখতে পারে। তারপরেও অদাবিকৃত থাকলে ভিন্ন একটি ফান্ডে তা স্থানান্তর করতে হয়।
কেন বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ পান না
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সময় প্রাপ্য লভ্যাংশ পাওয়ার আগেই শেয়ারহোল্ডার মারা যান। অথবা কোনো কোম্পানিতে থাকা শেয়ারের বিষয়ে ভুলে যান। পাশাপাশি পরিমাণে অল্প হওয়ার কারণে অনেক সময় বিনিয়োগকারী ওই লভ্যাংশ নিতে আগ্রহী হন না। এছাড়াও বিও একাউন্টে ব্যাংক একাউন্ট আপডেট না থাকাসহ প্রক্রিয়াগত কারণে অনেক সময় ঘোষিত লভ্যাংশ বিনিয়োগকারী পান না। কোম্পানিগুলোর অবন্টিত এসব লভ্যাংশ ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত হিসেবে থাকা দাবিহীন টাকা নিয়ে ২০২১ সালে একটি পৃথক ফান্ড গঠন করে বিএসইসি। বিধি অনুযায়ী, তিন বছরের বেশি সময় ধরে থাকা অদাবিকৃত লভ্যাংশ এই ফান্ডে স্থানান্তর করতে হবে।
অদাবিকৃত লভ্যাংশ নিয়ে বিএসইসির নির্দেশনা
অদাবিকৃত লভ্যাংশের বিষয়ে নির্দেশনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, এক্ষেত্রে অদাবিকৃত বা অনিষ্কৃত লভ্যাংশ যদি থাকে, এই লভ্যাংশ তিন বছর পর্যন্ত কোম্পানির কাছে থাকবে। এরপর এটা কোন বছরের, কার কতটুকু, বিও একাউন্ট, তার নাম, নমিনি ও বিস্তারিত তথ্যসহ প্রথমে তার ওয়েবসাইটে একবার প্রকাশ করবে। তার পরেও যদি কেউ এটা না নেয় তাহলে পুরোটা ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করতে হবে।
বিধান মানছে না অনেক কোম্পানি
তবে অদাবিকৃত লভ্যাংশ নিয়ে এমন বিধান অনেক কোম্পানিই অনুসরণ করছে না। কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ লভ্যাংশ না দেওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। নিরীক্ষকদের মতে, এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আদেশের পরিপন্থী এবং কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
১২টি কোম্পানির অদাবিকৃত লভ্যাংশের চিত্র
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১২টি কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এসব কোম্পানিতে অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণ না করে বছরের পর বছর এভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ফরচুন সুজের ১০ কোটি ৫ লাখ, ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ের ২ কোটি ৬১ লাখ, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের ১ কোটি ৪৮ লাখ, কে অ্যান্ড কিউ বাংলাদেশ লিমিটেডের ৩২ লাখ ৬৮০ টাকা, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের ৩৫ লাখ ২১ হাজার, সাফকো স্পিনিং মিলসের ১১ লাখ ৩১ হাজার, ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের ৫৯ লাখ ৬৮ হাজার, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ১৯ লাখ ৮৪ হাজার, ওরিয়ন ফার্মার ২৮ কোটি ৪৪ লাখ, তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের ৪৯ লাখ এবং ইনফরমেশন সার্ভিসের ২৪ লাখ ৫২ হাজার টাকার অদাবিকৃত লভ্যাংশ রয়েছে। এছাড়া জুট স্পিনার্সের অদাবিকৃত লভ্যাংশের পরিমাণ জানা সম্ভব হয়নি। এই সংখ্যা শুধু এই ১২টি কোম্পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, আরও অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে একই চিত্র রয়েছে। এসব লভ্যাংশ তিন বছরেরও অধিক সময় ধরে কোম্পানিগুলোতে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে তা ১৪ বা ১৫ বছরের মতো দীর্ঘ সময়ে অদাবিকৃত হিসেবে পড়ে রয়েছে।
কোম্পানিগুলোর বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে বক্তব্য চাওয়া হয়। মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি সেক্রেটারি ওমর ফারুক বলেন, এগুলো বহু পূর্বের। বর্তমান ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নিয়েছে ২০২৩ সালের শেষের দিকে। এগুলো তারও বহু পূর্বের। আনপেইড ডিভিডেন্টগুলো যখন নতুন ম্যানেজমেন্টের কাছে ট্রান্সফার করে তখন দেখা গেছে যে প্রায় ১৪/১৫ বছর পরে সিডিবিএল এগুলোর রিপোর্টগুলোও ঠিকমতো কন্টিনিউ করেনি। এখনও এগুলো শনাক্ত করাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি। এই কারণে এগুলো শনাক্ত করে সুন্দর করে একটা প্রক্রিয়ায় এটাকে যদি বিতরণ করা যায় ভালো। আর না হলে সরকারের যে ফান্ড আছে সেখানে দিয়ে দিতে হবে। তবে এগুলো শনাক্ত করতে একটু সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।
আরেক প্রতিষ্ঠান ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সেক্রেটারি মহিউদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে বিএসইসি ডেকেছিল, সেখানে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ের কোম্পানি সচিব নুর মোহাম্মাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় মন্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে কোম্পানিটির সিএফও এবং এমডিকে ফোন দিলেও পাওয়া যায়নি। বাকি কোম্পানিগুলোর কোম্পানি সেক্রেটারিকে ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতামত
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য আল আমিন বলেন, অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণে কোম্পানিগুলোর অনেক ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে বা গড়িমসি করে। কারণ এই টাকাগুলো বিনিয়োগকারীরা না নিলে কোম্পানি ব্যবহার করতে পারে। এটা তো আসলে শেয়ারহোল্ডারের প্রাপ্তি। শেয়ারহোল্ডাররা যেহেতু নিচ্ছে না, সেজন্য এটাকে ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ডে দিয়ে দেওয়া উচিত।
সিএমএসএফ নিয়ে বিতর্ক
তবে অদাবিকৃত লভ্যাংশের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড নিয়েই প্রশ্ন তোলেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেভাবে ফান্ড চলছে তাতে ফান্ডটা নিয়েই আমাদের আপত্তি আছে। এটার পুরো টাকাই মিসইউজ হয়েছে। আমরা তো বলছি ফান্ডটা নিয়ে আগে কাজ করা উচিত। এটা যেভাবে আছে, এভাবে এটাকে আমরা ঠিক মনে করি না। এটার যদি ট্র্যাক রেকর্ড দেখেন তো খুব অসচ্ছ ও ইনট্রান্সপারেন্ট। তাই আগে ফান্ডকে ট্রান্সপারেন্ট করতে হবে, তারপর সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
বিএসইসির অবস্থান
এদিকে ফান্ডের নাম নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে কার্যক্রম স্বচ্ছ দাবি করে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকারও এটার (সিএমএসএফ) স্বীকৃতি দিয়েছে। নাম নিয়ে সমস্যা থাকলেও ফান্ডে কোনো সমস্যা নেই।
আর বছরের পর বছর অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণ না করা এসব কোম্পানির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এগুলো দেখছি, বিস্তারিত খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এএ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













