

দেশের বেসরকারি খাতের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে দখলে নিয়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে এস আলম। ঋণের নামে শুধু টাকা লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি এস আলম ও তার ছেলে আহসানুল আলম। দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার থেকে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় গুলশান-২-এর ৯৫ নম্বর রোডে স্থানান্তরের কার্যক্রমও শুরু করেছিল তারা। আর এ কাজ করতে গিয়েও ভয়াবহ প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম। মালিকানা গোপন রেখে নিজের কোম্পানি ব্লাইদ লিমিটেড এবং মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেড থেকেই ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জন্য ভবন ভাড়া নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তিনি। এমনকি মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিও করেছিলেন। এজন্য ২০২৪ সালের এপ্রিলে অগ্রিমের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৪৫ কোটি ৫১ লাখ টাকাও পরিশোধ করেছে ইসলামী ব্যাংক। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলে এস আলমের দখল থেকে মুক্ত হয় ইসলামী ব্যাংক। ফলে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
ইসলামী ব্যাংকের এক অভ্যন্তরীণ তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসব কার্যক্রমের সময় ইসলামী ব্যাংকের অপারেশন উইংয়ের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিম। উইংয়ের প্রধান হিসেবে তাকেও দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন মতে, মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয় গুলশান-২-এর ৯৫ নম্বর রোডের ১ ও ৭ নম্বর প্লটে স্থানান্তরের প্রস্তাব নিয়ে ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট ব্যাংকের ৩১৩তম বোর্ড সভায় আলোচনা হয়। এবং একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর এ লক্ষ্যে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
আর ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট ও ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ ব্লাইদ লিমিটেড থেকে গুলশান-২-এর ৯৫ নম্বর রোডের ১ ও ৭ নম্বর প্লটে বাণিজ্যিক ভবন ভাড়ার জন্য দুটি অফার লেটার গ্রহণ করে ইসলামী ব্যাংক। ওই সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম। এছাড়া একই বছরের ৬ জুন মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেড থেকে আরেকটি অফার লেটার গ্রহণ করে ইসলামী ব্যাংক।
তারপর ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল, ৮ জুন এবং ২০ জুন এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন থেকে একাধিক অফিস নোট ইস্যু করা হয়।
৩৪১ কোটি টাকার অগ্রিম অনুমোদন
এ লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল গুলশান-২-এর ৯৫ নম্বর রোডের ১ ও ৭ নম্বর প্লটে ১৮ তলা বাণিজ্যিক ভবন ভাড়া নেওয়ার জন্য একটি বোর্ড মেমো উপস্থাপন করা হয়। এতে অগ্রিম হিসেবে ৩৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ জুন বোর্ডের পরিচালকরা এটি অনুমোদন করেন। ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার লঙ্ঘন করে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
৩২৫তম বোর্ড সভায় পাঁচ ধাপে অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত
এছাড়া ২০২৩ সালের ২২ জুন ব্যাংকের ৩২৫তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাঁচ ধাপে অগ্রিম হিসেবে ৩৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা প্রদানের বিষয়টিও অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ৪ জুন ব্লাইদ লিমিটেড (ভাড়াটে) এবং মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেড (ইজারাদার)-এর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ জমি ২৫ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়ার একটি অলিখিত চুক্তি হয়। এতে প্রতি বছর ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
আর ২০২৩ সালের ১১, ২৪ ও ৩০ জুলাই এবং ২ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে গুলশানে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চারটি চিঠি দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু শর্ত দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের আবেদন অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে অগ্রিম ৩৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকার মধ্যে ২২৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
চুক্তি স্বাক্ষর ও অর্থ পরিশোধ
২০২৪ সালের ২ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংকের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন থেকে অনুমোদনের বিষয়ে মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ আহমেদকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। একই দিনে মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেড থেকে ইসলামী ব্যাংকে চিঠি দিয়ে অগ্রিম টাকার ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রথম কিস্তি হিসেবে পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডের অনুকূলে ৪৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়ার অনুমোদন দেয় ইসলামী ব্যাংক। এবং একই দিনে মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে তিন বছর পর ভবনটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের কথাও উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে একই মাসের ২৪ তারিখে ব্যাংকের ৩৩৫তম বোর্ড সভায় এটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার তথ্য গোপন
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে ইসলামী ব্যাংক উল্লেখ করে যে, এই ভাড়া বা স্থানান্তরের সঙ্গে মালিক বা পরিচালকদের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে ব্লাইদ লিমিটেড একটি লিমিটেড কোম্পানি এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আহসানুল আলম। এছাড়া ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর রাজউক কোম্পানিটিকে অনুমোদন দেয়।
ইসলামী ব্যাংকের তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে যে মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডও তৈরি করেছেন আহসানুল আলম। মূলত নিজের মালিকানা গোপন করতেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ইসলামী ব্যাংকের তদন্ত টিমের ধারণা, মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডকে সুবিধা দিতেই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকরা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় গুলশানে স্থানান্তরের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এস আলমের কবল থেকে ইসলামী ব্যাংক মুক্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন থেকে খাতুনগঞ্জ শাখাকে মারকুইজ হোল্ডিং লিমিটেডের অনুকূলে অর্থ প্রদান বন্ধ করতে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তারা অর্থ প্রদান বন্ধ রাখে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসব কার্যক্রমের সময় ইসলামী ব্যাংকের অপারেশন উইংয়ের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ডিএমডি ও ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিম। উইংয়ের প্রধান হিসেবে তিনিও দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি বিষয়টি উল্লেখ করে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে মেসেজ দিলেও কোনো জবাব দেননি।
এএ