বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্ব সম্পন্ন
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০১-৩১ ১৯:২৬:৩৩

বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড (বিডিইও) ২০২৬ জাতীয় পর্ব সম্পন্ন হয়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে উৎসবমুখর পরিবেশে এই পর্বের সম্পাপ্তি হয়। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় চারশো শিক্ষার্থী তাদের অর্থনৈতিক জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
আয়োজকরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। দিনব্যাপী এই আয়োজন বাংলাদেশের শিক্ষা ও অর্থনীতি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই আয়োজনে তিন ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণকারীরা অর্থনৈতিক যুক্তি, তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রদর্শন করে মেধার স্বাক্ষর রাখেন। দিনের শুরুতেই সকল অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরীক্ষার নিয়মাবলী ব্রিফিং শেষে শুরু হয় জাতীয় পর্যায়ের বাছাই পরীক্ষা, যা চলে বেলা ১১ টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত। পরীক্ষার স্ক্রিপ্ট মূল্যায়ন ও বিরতি শেষে দুপুর ১২ টা ১৫ টায় মূল অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী পর্ব শুরু হয়।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের নির্বাহী কমিটির সভাপতি মো. আল-আমিন পারভেজের উদ্বোধনী ব্যক্তবের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইকোনমিক্স অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তরবর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ড. সায়েমা হক বিদিশা। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মোঃ হাবিবুর রহমান। এছাড়াও ডিজিটাল ব্যাংকিং এর গুরুত্ব ও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন পুবালী ব্যাংক পিএলসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী। অনুষ্ঠানে আগত অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ব্যাংকিং বিষয়ক বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংক পিএলসি-র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আশানুর রহমান। অনুষ্ঠানে অর্থনীতি বিষয়ক শিক্ষার্থীদের সাথে ইন্টারেক্টিভ সেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের অ্যাম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের সভাপতি মো: আল-আমিন পারভেজ জানান, বাংলাদেশ ইকোনোমিকস অলিম্পিয়াড তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অর্থনৈতিক প্রয়াস ছড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডে থেকে নির্বাচিত টিম আন্তর্জাতিক ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডে ৪টি পদক অর্জন করে।
তিনি বলেন, এই ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড শিক্ষার্থী এবং পলিসি মেকারদের মধ্যে সেতুবন্ধন গঠন করেছে, আর্থিক চিন্তাভাবনার বিকাশে ভুমিকা রাখছে। দায়িত্বশীল একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে , আমরা চাই সচেতন এবং অর্থনৈতিকভাবে জ্ঞানী সমাজ গড়ে তুলতে যাতে দেশের অর্থনীতিতে শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, অর্থনীতি আসলে সর্বত্র বিদ্যমান, একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তার চেষ্টা করার সাথে সাথে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও চিন্তা করতে হবে। বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড এর আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই এ জন্য, এই প্রতিযোগীতা দেশের তরুণ সমাজকে অর্থনীতির প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবিক ক্ষেত্রে প্রয়োগেও আরো আগ্রহী করে তুলসে।
সভাপতির ব্যক্তব্যে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশজুড়ে ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের প্রতি তরুণদের মাঝে আগ্রহ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির প্রায়োগিক দিক কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নাগরিককে সক্ষম ও দক্ষ করে গড়ে তোলা।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা অপরিহার্য। এই অলিম্পিয়াড শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি তরুণদের জন্য একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যা তাদের বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে এবং সারাদেশে অর্থনৈতিক সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বাংলাদেশে ডিজিটাল কারেন্সির গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বিনিয়োগের জন্য। বাজার অর্থনীতি এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যুব প্রজন্মের কাজ করার মূল ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি। তাই পরিবর্তিত বিশ্বে নিজেকে টিকেয়ে রাখতে প্রায়োগিক অর্থনীতি সম্বন্ধেও তরুণ সমাজের আরো প্রসার করতে হবে এবং এই ধরণের ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।
অনুষ্ঠানে কি-নোট স্পিকারের বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মোঃ হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, তরুণ সমাজকে তাদের মেধা, শ্রমকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা জানতে হবে, শিখতে হবে। তারা তাদের সময়, মেধাকে সেভাবেই ব্যবহার করবে যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ফলাফল অর্জন সম্ভব। বাংলাদ্দেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড সেরকমই একটি সুযোগের সৃষ্টি করেছে এই দেশের তরুণদের জন্য।
অন্তরবর্তীকালীন সরকারের মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে জানান, আমরা প্রতিভা লালনে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে যারা জাতীয় সমস্যার নিরসন করবে, আমি এই প্রতিযোগীতাকে তাদের একটি পথপ্রদর্শনা বলতে পারি। ব্যক্তিগত সাফল্য প্রয়োজনীয় কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কতটা সম্পদশালী বা দক্ষ। অর্থনীতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে প্রতিটি মানুষকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে এই দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে।
অনুষ্ঠানে আগত অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ব্যাংকিং বিষয়ক বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন। তিনি তরুণ অর্থনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বলেন, আধুনিক ব্যাংকিং খাত শুধুমাত্র আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে আগ্রহী হতে এবং আর্থিক সাক্ষরতার প্রতি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংক পিএলসি-র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আশানুর রহমান। তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ হতে হলে শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব জীবনের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করেন।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের এম্বাসেডর মো: মানসুরুল হক কর্তৃক পরিচালিত ইন্টারেক্টিভ সেশন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। এই সেশনে শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রি স্পেশালিস্টদের তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার, বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে জানার এবং ক্যারিয়ার পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
বিজয়ীদের তালিকা
জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত বাছাই পর্ব শেষে তিনটি ক্যাটাগরিতে শীর্ষ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। জুনিয়র ক্যাটাগরি বিভাগে সফলতার সাথে বিজয়ীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন তানজিম কামাল, শাহীর হাসনাইন এবং এস.এম তাওফিক তাসিন। ইন্টারমিডিয়েট ক্যাটাগরি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন স্বাধীন শাকির, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন আয়াশ মাহরুস খান এবং তৃতীয় হয়েছেন জাইফ বিন মোর্শেদ।
এডভান্স ক্যাটাগরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই বিভাগের বিজয়ীরা হলেন— সিফাত কামাল, মোঃ জিম মিন সিদ্দিক সৌধ এবং মোহাম্মদ সাইফ। অনুষ্ঠানে প্রথম স্থাম্ন অর্জনকারীদের নগদ ২০ হাজার টাকা, সম্মাননা মেডেল প্রদান করা হয়। পাশাপাশি অনুষ্ঠানকে তরান্বিত করতে রিজিওনাল ক্যাম্পাস এম্বাসেডর, লোকাল পার্টনারদেরও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
বিএইচ







সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













