
একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পুঁজিবাজার। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারে চলছে অস্থিরতা। বিভিন্ন সময়ে সরকারের তরফ থেকে আশার বাণী শোনানো হলেও প্রকৃত অর্থে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন উপেক্ষিতই থেকেছে। তাই তো এই বাজার ঘিরে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা। পুঁজিবাজারের এমন সংকটের মধ্যেই সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের পরে দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন এমন ব্যক্তিও পেয়েছেন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব। তাই তো বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। সেই সঙ্গে এ প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে—নতুন সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের ভাগ্য বদলাতে পারবে, নাকি প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধানই হয়ে উঠবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার তাদের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের পাশাপাশি বাজারে আইপিও সরবরাহ নিশ্চিত করে পুঁজিবাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে কাজ করবে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটগুলো কী
দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘ বছর ধরে নানামুখী সংকটে জরাজীর্ণ। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সুশাসনের অভাব, প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকা এবং অনিয়ম ও কারসাজিকারীদের যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনা—এসব কারণে তৈরি হয়েছে এই সংকট।
পাশাপাশি নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্ত না হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা যোগ করেছে নতুন মাত্রা। দেশের আর্থিক খাতে অনিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় পুঁজিবাজারেও বড় বড় অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যৌথভাবে কারসাজিতে জড়িত হয়ে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করেছেন। বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে তছরূপের ঘটনাও ঘটেছে। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে লুটপাট করা হয়েছে। আর এসব ঘটেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ব্যর্থতা ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এই বাজারকে অকার্যকর হওয়ার জন্য দায়ী।
ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়নের দাবি
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজার নিয়ে বিশদ পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার শিরোনামে পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়নের বিষয়ে দলীয় অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। এতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠন, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা আনয়ন, কারসাজি বন্ধ করা, শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গঠন, কর্পোরেট বন্ড ও সুকুক প্রবর্তন এবং প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালুর অঙ্গীকার করা হয়। এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করা, স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়। এছাড়াও পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত শিক্ষার প্রসারের ব্যাপারেও অঙ্গীকার করা হয় ইশতেহারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি পুঁজিবাজার নিয়ে নিজেদের অঙ্গীকার তুলে ধরেছিল। নির্বাচনের পর তারা সরকার গঠন করেছে। বিএনপি তাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করলেও পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে মনে করেন তারা।
নতুন সরকারের নিকট প্রত্যাশা জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা খুবই অল্প। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব বিষয়ে বলেছেন, সেগুলো যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে আমাদের আর বিশেষ চাহিদা থাকবে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “দুইটি রাজনৈতিক দল—জামায়াত এবং বিএনপি—নির্বাচনের পূর্বে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। বিএনপির ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অনেক নির্দেশনা ছিল। সেটাও যদি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ, যেগুলো বাজারের জন্য সহায়ক, সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে সরকার এগিয়ে যায়, তাহলে সব মিলিয়ে আমি মনে করি খুব ভালো কিছু আমরা দেখতে পারব।”
নতুন শেয়ার আনতে আশু পদক্ষেপ দাবি
পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন সরকারের প্রাধান্য কী হওয়া উচিত—এ বিষয়ে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে। তবে সবাই একটি বিষয়ে আশু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো নতুন আইপিও নিশ্চিত করা, যা প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন খারাপ। ফলে বাজার এখন পচা শেয়ারে সয়লাব। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের জন্য আইপিও অনুমোদন পায় টেকনো ড্রাগস। আর ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর আইপিও পায় এনআরবি ব্যাংক। এর পর থেকে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। তাই নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ভালো শেয়ার বাজারে আনতে খুব দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশ্লেষকরা।
পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের আশু পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, “এখনই যেটা দরকার সেটা হলো বাজারে সরকারি শেয়ারগুলো ছেড়ে দেওয়া। বাজারে নতুন শেয়ার আসলে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও ভালো করবে এবং বাজার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। কারণ কেনার মতো ভালো শেয়ার মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও পাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন অধ্যাপক আল-আমিন। এর পাশাপাশি আইন-কানুন দ্রুত বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন তিনি। অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “আইন-কানুনগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগের সরকারের অনেক ধীরগতি ছিল। প্রধান উপদেষ্টার একটি নির্দেশনা ছিল যে দেশীয় কোম্পানিগুলোর যেগুলো লাভজনক সেগুলোকে তালিকাভুক্ত করা বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে থাকা সরকারের শেয়ারগুলোকে বাজারে নিয়ে আসা। মানে বাজারে যদি কোয়ালিটি শেয়ারের সরবরাহ না বাড়ানো যায় তাহলে নতুন করে বিনিয়োগকারী আসবে না।”
নতুন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণে প্রত্যাশা বেশি
নতুন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের ফলে বাজার অংশীজনদের মধ্যে প্রত্যাশাও যেন একটু বেশি। তাদের মতে, নতুন অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট এবং এই বাজার নিয়ে পূর্বের বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি ধারণা রাখেন। তিনি একাধিকবার পুঁজিবাজার নিয়ে দলের অঙ্গীকার তুলে ধরার পাশাপাশি এই বাজারকে শক্তিশালী করার পক্ষে কথা বলেছেন। তাই অতীতের চেয়ে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তিনি অধিক সক্ষমতার প্রমাণ দেবেন বলে প্রত্যাশা অনেকের।
অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “আমাদের অর্থমন্ত্রী যেহেতু নিজেই পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট, বাজার সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা অনেক ভালো। সেক্ষেত্রে তিনি যদি শুধু সচেতনভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ও বিএনপির ইশতেহার বাস্তবায়নে যাদের প্রয়োজন তাদের নির্দেশনা দেন, আমি মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়েও ভালোভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন। আর তখনই হয়তো মানুষের আস্থা ফেরত আসবে।”
নিয়ন্ত্রক সংস্থাতেও দরকার পরিবর্তন
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর কাজেও আস্থা নেই বাজার সংশ্লিষ্টদের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপে সমালোচিত হয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বিরুদ্ধে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরোধ, বাজারে নতুন আইপিও আনতে ব্যর্থতা এবং ধারাবাহিক জরিমানা আদায়ের মতো কর্মকাণ্ড বাজারে চরম অনাস্থা ও স্থবিরতা তৈরি করেছে। তাই পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অপসারণও দাবি করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুঁজিবাজার-কেন্দ্রিক সেবা প্রদানকারী এক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “মার্কেট ডিমান্ড হলো বর্তমান কমিশনের অপসারণ। সংস্থাটির নেতৃত্বে পরিবর্তন ছাড়া বাজারে আস্থা ফিরবে না।”
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, “নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রথম প্রত্যাশা হলো বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যানের অপসারণ। তার অপসারণ ছাড়া মার্কেট ভালো হবে না। আমরা প্রত্যাশা করি সরকার তাকে অপসারণ করবে।”
প্রয়োজন সংস্কার ও বাজারবান্ধব নীতি
পুঁজিবাজারে সংস্কার কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাদের মতে, সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত না হলে বর্তমান অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তনের আশা করা যায় না।
বিনিয়োগ পরামর্শ সেবা প্রদান করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, “পুঁজিবাজার ঘিরে প্রত্যাশা দীর্ঘমেয়াদি। পুঁজিবাজারকে একদিনে পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব না। পুঁজিবাজারকে ঠিক করতে হলে আগে যোগান নিশ্চিত করতে হবে। গত দেড়-দুই বছরে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এখনও কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্ত হওয়ার আবেদন জমা নেই। সামনে যে হবে তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। এরকম একটি ড্রাই মার্কেটে যদি যোগান নিশ্চিত না করা যায় তাহলে নতুন ফান্ড আসবে না। আবার চাহিদার দিক থেকেও দেখা যায় যে বাজারের স্থিতিশীলতা না থাকায় নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। কাজেই এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করতে হবে।”
তিনি বলেন, “গত দশ বছরে পুঁজিবাজারে রিটার্ন ১ শতাংশেরও কম। এফডিআর করলে ৮ থেকে ৯ শতাংশ রিটার্ন আসে। ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করলেও ১০ শতাংশ রিটার্ন আসে। তাহলে এই মার্কেটে মানুষ কেন বিনিয়োগ করতে আসবে? সেক্ষেত্রে ট্যাক্সেশনে ফোকাস দিতে হবে। পাশাপাশি অনেক বিধি-বিধান আছে যেগুলো বাজারের জন্য সংকোচনমূলক। এসব বিধি-বিধানকে নমনীয় করতে হবে।”
এএ