
দেশের ব্যাংক খাতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হল লাগামহীন খেলাপি ঋণ। আওয়ামী লীগের বিগত ১৬ বছরে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে ব্যাংক খাতে। ঋণের নামে জালিয়াতি করে নেয়া এসব টাকা আর ফেরত আসেনি। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড গড়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ দাড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ হাজার টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর এসব খেলাপি ঋণের মধ্যে বেড লোন মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৭১২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা খেলাপি ঋণের ৯৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় নজিরবিহীন শিথিলতার সুযোগে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ কমার কারণে কমেছে মন্দ ঋণের পরিমাণও।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর তিন মাস পর ডিসেম্বর শেষে মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৭১২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে মন্দ ঋণের পরিমাণ কমেছে ৬১ হাজার ৬৩৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ হাজার টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
তথ্যানুয়ায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও ডিসেম্বর নাগাদ তা কিছুটা কমেছে। তবে এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকার প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রয়েছে। কিন্তু প্রভিশন ঘাটতি এখনও ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় ঘাটতি আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় অনেক গ্রাহক শ্রেণিকৃত ঋণ পুনঃতফসিলের আওতায় এনেছেন। ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ খেলাপি তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আড়ালে রাখা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নীতিগত সুবিধা দেওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কাগজে-কলমে কমে এসেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলা আরোপ না করলে ভবিষ্যতে আবারও খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে যথাযথ যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন গোপন থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পুনর্মূল্যায়নে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ আড়াল করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের শুরু থেকে প্রতি প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণের অঙ্ক বাড়তে থাকে, মার্চে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি, জুনে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে তা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটিতে পৌঁছায়। বিদেশি অডিট ফার্মের নিরীক্ষা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ফলে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এএ