নির্বাচন আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পুঁজিবাজার নিম্মমূখী থাকলেও নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার দ্বায়িত্ব গ্রহণের পরে দেখা দিয়েছে চাঙ্গাভাব। তবে এরই মধ্যে ইরানে ইসরাঈল ও যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর সেই চাঙ্গাভাবে চিড় ধরেছে। এর পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তনের গুঞ্জন। ফলে গত সপ্তাহজুড়ে পুঁজিবাজারে আবারও ফিরে এসেছে পতনের ধারা। নতুন করে প্রশ্নে উঠেছে ইরান যুদ্ধ নাকি বিএসইসির নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাজারে এমন নিম্নমুখী প্রবণতা? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারের নিম্নমুখীতার জন্য দায়ী। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মতে, বিএসইসির নেতৃত্বে কাঙ্খিত পরিবর্তন দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা কাজ করছে, যেটি এর অন্যতম কারণ।
বাজার পরিস্থিতিতে কী পরিবর্তন ঘটল?
নির্বাচনের আগে সর্বশেষ পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছিল গত ১০ ফেব্রুয়ারী। এদিন প্রধান পুঁজিবাজারের মূল্যসূচক ডিএসইএক্স এর অবস্থান ছিলো ৫ হাজার ৪০০ পয়েন্ট। এদিন বাজারটিতে মূলধনের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৯৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ১২ই ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের পরে ১৫ ফেব্রুয়ারী থেকে পুঁজিবাজারে আবারও লেনদেন চালু হয়। এদিন থেকে সূচকে বড় পরিবর্তনের মাধ্যমে বাজারে ঊর্ধ্বমুখীতার দেখা মেলে। এদিন ডিএসইএক্স সূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। আর বাজার মূলধন বাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এদিন বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পূর্বে গত ২৬ ফেব্রুয়ারী ডিএসইএক্স মূল্যসূচক ছিল ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্ট। আর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে গত ২৮ মে ইরানে ইসরাঈল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পহেলা মার্চে মূল্যসূচকে ১৩৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৬১ পয়েন্টে নেমে আসে। আর বাজার মূলধন কমে ৮ হাজার ৮৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এদিন বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ১০ হাজার ২৭৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। যুদ্ধ চলমান থাকলেও পরের কার্যদিবস গত ২ মার্চে বাজারে আবারও ঊর্ধমুখীতা দেখা যায়। এদিন মূল সূচকে ৭২ পয়েন্ট বাড়ে। বাজার মূলধন বাড়ে ৩ হাজার ৯২২ কোটি ৩০ লাখ। তবে পরের কার্যদিবসগুলোতে পতনের ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে গত সপ্তাহের সর্বশেষ কার্যদিবসে ৫ হাজার ২৪০ পয়েন্টে নেমে আসে। পাশাপাশি বাজার মূলধন কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
কি বলছেন বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সাধারণত বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বা যুদ্ধ দেখা দিলে জ্বালানি বাজারসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার প্রভাব উদীয়মান অর্থনীতির বাজারগুলোতে বেশি পড়েছে। ফলে দেশের পুঁজিবাজারেও এই প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পরে বা নির্বাচনের একেবারে আগ মুহূর্তে আমাদের উত্থান তো ভালো ছিল। দুঃখজনকভাবে ইরান যুদ্ধটা আমাদের পুরা মার্কেটকে একটু শঙ্কিত করেছে। এ কারণে সারা পৃথিবীর মতো আমরাও বুঝতে পারছি না যে এক মাস পরে কি হবে। যদি যুদ্ধ অনেকদিন লম্বা হয় তাহলে তো আমাদের জন্য একটু চ্যালেঞ্জিং সিচুয়েশন। যার কারণে বিনিয়োগকারীরাও একটু দ্বিধান্বিত, কিছুটা বিচলিত। সারা পৃথিবীতে একই অবস্থা। এখন আমাদের হয়তো আরো এক সপ্তাহ খানিক অপেক্ষা করে দেখতে হবে কি অবস্থা দাঁড়ায়।
বিএসইসির নেতৃত্বে রদবদলের গুঞ্জনের কোন প্রভাব আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ অবশ্যই, কিছুটা প্রভাব তো থাকবেই। এটাও উত্থান পতনের একটা কারণ। তবে মূল কারণ ইরান যুদ্ধ বলে জানান তিনি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান বিএসইসির চেয়ারম্যানের ওপরে বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের কোন আস্থা নেই। তাই বর্তমান বাজারের চাহিদা হলো চেয়ারম্যানের অপসারণ। তাঁর অপসারণ ছাড়া বাজারে পূর্ণাঙ্গ আস্থা ফিরে আসবে না।
একই দাবি বিনিয়োগকারীদেরও। বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির উপর পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়ানো নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজার যে মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াবে সেই সময়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের অপসারণটা বিলম্বিত হওয়ায় এটা মার্কেটকে চাপের মধ্যে ফেলছে। যুদ্ধের মধ্যেও যদি তার অপসারণের খবর আসে দেখবেন ওর মধ্যেই বাজারে উত্থান দেখা যাবে।
তিনি জানান, যুদ্ধের প্রভাব এবং বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের অপসারণ বিলম্বিত হওয়া, দুইটা মিলে মার্কেটটা এখন চাপের মধ্যে পড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নজর রাখছেন—নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব পরিবর্তনে সরকারের কি পদক্ষেপ নেয় সেদিকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে ইতিবাচক ধারা ফিরে আসবে কিনা তা নির্ভর করছে আগামী দিনে যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তাঁর উপর। এর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বিদ্যমান অনিশ্চয়তা কতদিন থাকবে তাঁর উপরও নির্ভর করবে।