ফেনীর সোনাগাজী বগাদানা ইউনিয়নে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন পাইকপাড়া গ্রামের এবাদুল হকের ছেলে দিদার হোসেন। অনাবাদি পড়ে থাকা এবার প্রথম বারের মত তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন তিনি। ইতোমধ্যেই গাছে ফুল ধরতে শুরু করেছে। এক একটি ফুল যেন হাসিমুখে সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে। চারিদিকে হলুদ ফুল আর সবুজ গাছে সে এক অপরূপ দৃশ্য। প্রতিদিন আশপাশের এলাকা থেকে সৌন্দর্য পিয়াসু মানুষ সূর্যমুখী ফুলের খেত দেখতে আসছে। অনেকেই ফুলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন।
উদ্যোক্তা দিদার হোসেন বলেন, আমি পড়াশুনা বিএসএস কমপ্লিট করে এলএলবি তে অধ্যায়রত আছি। আমি পূর্বে একটা ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলাম। এর পর সমাজ সেবা অধিদপ্তরে একটা প্রকল্পের মাধ্যমে চাকুরীতে যোগদান করি।পরবর্তীতে প্রজেক্ট এক্সটেনশন না হওয়াতে আমি বেকারত্ব বোধ করি। পরে আমি কৃষি কাজের সাথে ঝুকি। প্রথমে আমি ও আমার ছোট ভাই ছানাউল্যাহ একটা খামার করার পরিকল্পনা করি। নিজের কাছে যে সামান্য কিছু নগদ অর্থ ছিল সেটি দিয়ে একটা খামারের মত করে ঘর তৈরি করি। যার নাম দিয়েছি মায়ের দোয়া এগ্রো এন্ড ডেইরী। অর্থ সংকুলনের কারণে সমবায় অধিদপ্তর সোনাগাজী শরণাপন্ন হই। ঐখান থেকে কিছু ঋন নিয়ে ঐ ঋনের টাকা দিয়ে ২ টা গরু কিনে খামার চালু করি। বর্তমানে আমার খামারে মোটা তাঁজা সহ মোট ৬ টি গরু আছে। পাশাপাশি আমার নিজস্ব পতিত জমিতে কৃষি অফিসের পরামর্শ ও প্রনোদনা নিয়ে সূর্য্যমুখি চাষ করি। আলহামদুলিল্লাহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে আমার নিজ পরিবারে সারা বছরের তেলের চাহিদা মিটিয়ে বেশ কিছু বিক্রিও করতে পারবো। পাশাপাশি গো খাদ্যের জন্য প্রায় ৭০ শতক জমিতে ঘাস চাষ করেছি। তবে আমাদের এ মাঠে প্রায় ১০০ একর জমি ও পাশে আরেকটা মাঠে প্রায় ১০০ একর জমি রয়েছে। যেখানে সেচের কারণে প্রায় ২ তৃতীয়াংশ জমি অনাবাদি পড়ে থাকে সেচ ব্যবস্থা না থাকার কারণে। যদি সেচ ব্যবস্থা হয় তাহলে সবাই এ জমি গুলতে তিন মৌসুমে চাষাবাদ করতে পারবো। আমার এবারের সূর্য্যমুখি চাষ দেখে এখানকার স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন করে চাষের আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তবে সেচের ব্যবস্থা না হলে চাষ করা সম্ভব নয়। কেননা সূর্য্যমুখি চাষে প্রায় ৪-৫ বার সেচ দিতে হয়। এছাড়া আমি বিষয়টি উপজেলা সমবায় অফিসার, কৃষি অফিসার ও ইউএনও মহোদয় কে জানিয়েছি। আমার আগামীতে ভার্মি কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস প্লান্ট করার চিন্তা রয়েছে।
পাশের স্থানীয় এক কৃষক জানান, দিদার আমাদের এলাকার একটা শিক্ষিত ছেলে। সে যে কৃষি কাজ করবে আমরা চিন্তাও করি নাই। সে আমাদের কে অনাবাদি জমিতে সূর্য্যমুখি চাষ করে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আগামীতে আমরাও সূর্য্যমুখি চাষ করবো।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় এবার সূর্যমুখী ৫০ হেক্টরের মত আবাদ হয়েছে। বর্তমান বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা হেক্টর প্রতি ১.৮৬ মেট্রিক টন । ১.৮৬ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উপজেলায় মোট উৎপাদন হবে আনুমানিক ৯৩ মেট্রিক টন। প্রতি কেজি ১শ টাকা হারে মোট উৎপাদন হবে কোটি টাকায় ৯৩ লক্ষ টাকা। এ বছর ৩১০ জন কৃষককে সূর্যমুখী প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। প্রতি কৃষক এক বিঘা জমির জন্য ১ কেজি সূর্যমুখী বীজ এবং ১০ কেজি ডিএপি সার এবং ১০ কেজি এমওপি সার দেয়া হয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের তেল ভাঙনোর ছোট-বড় মেশিন গুলোতে সূর্যমূখীর বীজ ভাঙিয়ে তেল নিষ্কাশন করে সে তেল দিয়ে পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করছে কৃষকগণ।
উপজেলা সমবায় অফিসার মোঃ হানিফ বলেন, দিদার হোসেন আমাদের নিবন্ধিত গৌধুলী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি আমাদের এখানের একজন উপকার ভোগী। তিনি কৃষি অফিসারের সহযোগিতা সূর্য্যমুখি চাষ করেছেন। পাশাপাশি তিনি ছাগল পালনও করছেন। তার একটি সম্মিলিত এগ্রো ফার্ম আছে। তার আকাঙ্ক্ষা একজন সফল উদ্যোগক্তা হওয়া। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা থাকবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মাইন উদ্দিন আহমেদ সোহাগ বলেন, বাজারে সূর্যমূখী তেলের ভালো চাহিদা ও দাম রয়েছে। সূর্যমূখী তেল পৃথিবী ব্যাপী পুষ্টি সমৃদ্ধ ভোজ্য তেল হিসেবে বহুল সমাদৃত। ডাক্তারগণ ও এ তেল খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিদেশ হতে বাংলাদেশে প্রতি বছর সূর্যমূখী তেল আমদানী করতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আমাদের কৃষকগণ এটি উৎপাদন করলে এ ব্যয় সাশ্রয় হবে। দিদার হোসেনের বহু রকমের প্রতিভা রয়েছে। তিনি যে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছেন আমাদের কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করে আসছেন আগামীতেও করা হবে।
এনজে