
বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় পুরোটা আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশীয় বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এখন একে একে সামনে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে “সংকট ও সংকীর্ণতা”—শুধু জ্বালানি নয় বরং নীতি, কৌশল এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সামনে এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।
ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি বাস্তবতায় বাংলাদেশে যেসব বিষয় প্রতিফলিত হচ্ছে সেগুলো হল:
১. ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ও জ্বালানি নির্ভরতা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে এটি প্রায় তিন দিক দিয়েই ভারত বেষ্টিত। এই বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। দেশের মোট শক্তির চাহিদার প্রায় ৯৫% আমদানিনির্ভর। আপনার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত সঠিক যে, একটি দেশপ্রেমিক সরকারের দাবি করা সত্ত্বেও ভারতের চাপে 'অয়েল টার্মিনাল'-এর পরিবর্তে 'পাইপলাইন' নির্মাণ করতে হয়েছে। এর ফলে নিজস্ব রিজার্ভ বা মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর চেয়ে প্রতিবেশী দেশের মজুতের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা আরও বেড়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
২. বৈশ্বিক জ্বালানি বিপর্যয় ও বাংলাদেশের চিত্র
বর্তমানে সারা বিশ্ব এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়:
• যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ: আমেরিকায় তেলের দাম গ্যালন প্রতি ১ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
• এশিয়া: জ্বালানি সমৃদ্ধ চীন ৪ বছরের মধ্যে ব্যক্তিগত জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সীমা (Cap) আরোপ করেছে। ভিয়েতনাম জ্বালানি সাশ্রয়ে হোম অফিস চালু করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি তো আমাদের সবার জানা।
• উৎপাদনকারী দেশ: এমনকি সিরিয়ার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশেও পাম্পে মারামারি ও হাহাকারের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসছে।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের বড় অংশ যেখানে আমদানিনির্ভর, সেখানে পেট্রোল পাম্পের লাইনের ছবি দিয়ে সস্তা রাজনৈতিক আনন্দ পাওয়া কেবল দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. অর্থনৈতিক অক্ষমতা ও নেতৃত্বের অভাব
জ্বালানি হলো একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার 'লাইফলাইন'। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্পট মার্কেট (Spot Market) থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে গ্যাস কেনার সক্ষমতা বা 'বিডিং ক্যাপাবিলিটি' আমাদের নেই।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো নেতৃত্বের অভাব। বর্তমান সময়ে যখন জাতিকে কৃচ্ছতা সাধনের কথা বলা দরকার, তখন বিনোদন কেন্দ্রের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালানি পুড়িয়ে অপচয় করা একটি জনতাকে শাসন করার মতো সাহসী নেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই "টক্সিক" এবং "গাওয়ার" (অজ্ঞ) মানসিকতার জনগোষ্ঠী বৃহত্তর সংকটের চেয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ বা 'বুচকি'র বাইরে তাকাতে পারছে না।
৪. ভারত-বিরোধিতা বনাম ক্ষমতার বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা সারাদিন ভারত-বিরোধী বা পাকিস্তান-পন্থী তকমা দিয়ে রাজনীতি করে, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার চ্যালেঞ্জটি বেশ জোরালো। আপনি বলতে চেয়েছেন, ফেসবুকের কিবোর্ডে দেশপ্রেম না দেখিয়ে যদি প্রকৃত অর্থেই কোনো শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা এবং "আয়রন বলস" (দৃঢ়চেতা) সম্পন্ন নেতৃত্ব থাকতো, তবে ৫ই আগস্টের মতো গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনতে জনগণ দ্বিধা করত না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাদের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তারাও পর্দার আড়ালে একই শক্তির সাথে 'গোপন মিত্রতা' বজায় রেখে চলছে।
৫. আসন্ন সংকট ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া খবর যে ইরান বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে, তার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু তা নিয়ে সন্দেহ আছে। প্রকৃত তথ্য হলো, ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল শোধনের সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে কারণ সৌদি আরব থেকে তেলের সরবরাহ আপাতত স্থগিত। কুয়েত থেকে আসা ১ লাখ ব্যারেল তেলের জাহাজটি কবে পৌঁছাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে একটি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভারতপন্থী বা অন্য কোনো শক্তির লেজুড়বৃত্তি করা সরকারের পরিবর্তন কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং কঠোর বাস্তবতা এবং সক্ষম নেতৃত্বের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
সারকথা: সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাদ দিয়ে দেশের প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যারা নিজেদের দেশপ্রেমিক দাবি করে, তাদের উচিত ভূ-রাজনীতির জটিলতা বুঝে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সাহসী নেতৃত্ব গড়ে তোলা, অন্যথায় কেবল ক্ষমতার পালাবদল হবে, ভাগ্যের নয়।
লেখক: মোঃ আনিসুর রহমান (সজল)
অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল
সামরিক বিশ্লেষক, লেখক ও সাহিত্যিক।