
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন: বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী তাদের সীমিত আয়ের মধ্যে পরিবার পরিচালনায় চরম সংকটে পড়েছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য পরিস্থিতি এবং জনজীবনের মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো—দ্রুত ও কার্যকর নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ৯ শতাংশের আশেপাশে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে তা অর্থনীতির সামগ্রিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, সঞ্চয়ের প্রবণতা হ্রাস পায়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল একটি নীতিগত বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো একক নীতি কার্যকর হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এই সব ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই নীতিগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা।
প্রথমত, শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ থাকলে তা পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং নীতিগত সুদের হার বাস্তবসম্মত পর্যায়ে রাখা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করে। তাই ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা অত্যন্ত প্রয়োজন। অতিরিক্ত বাজেট ঘাটতি এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা এবং অপচয় কমানো সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে কর আদায়ের পরিধি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। কর প্রশাসনের সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। এতে সরকারের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং অর্থনীতিতে অপ্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহও হ্রাস পাবে।
তৃতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের বাজারে অনেক সময় উৎপাদন পর্যায়ে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও অস্বচ্ছ মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য—সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে বহু স্তরের মধ্যস্থতাকারী কাজ করে, যা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন আধুনিক করা প্রয়োজন। গুদামজাতকরণ সুবিধা বৃদ্ধি, কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষক থেকে সরাসরি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় মূল্যবৃদ্ধি কমবে।
চতুর্থত, বাজার তদারকি এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারের উচিত বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা কমিশনকে আরও সক্রিয় করে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
পঞ্চমত, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় অংশই খাদ্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কৃষকদের জন্য সারের সহজলভ্যতা, সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে খাদ্য অপচয় কমবে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে।
ষষ্ঠত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। তাই সরকারের উচিত লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি এবং নগদ সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। তবে এসব কর্মসূচি যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ডাটাবেস ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই কার্যক্রমগুলো আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা সম্ভব।
সপ্তমত, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডলার সংকট বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামে পড়ে। তাই রপ্তানি বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় বাড়ানোর জন্য প্রণোদনা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অষ্টমত, তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্যের অভাবে নীতিনির্ধারণে বিলম্ব ঘটে। তাই অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
সবশেষে বলা যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কোনো সহজ বা স্বল্পমেয়াদি কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতির ফল। তবে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন করতে পারলে শুধু অর্থনীতিই শক্তিশালী হবে না; জনগণের আস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই মুহূর্তে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। তাই সময়োপযোগী নীতি, কঠোর বাস্তবায়ন এবং বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হতে পারে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। যদি এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতি আবারও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরে আসবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com