
একটু সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাতে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যাভিভা ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে সারাজীবনের সঞ্চয় স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমেন চৌধুরী। কিন্তু এখন তিনি সেই টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এমনকি তাঁর জমাকৃত টাকার লাভও দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠান দুটি। এই অবস্থায় টাকার অভাবে তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বলে বাণিজ্য প্রতিদিনকে জানিয়েছেন আব্দুল মোমেন চৌধুরী।
৮৭ বছর বয়সী সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমেন চৌধুরী এখন গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তিনি চিকিৎসার জন্যও দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিজের অর্থ তুলতে পারছেন না। এমনকি টাকা চাইতে গেলে দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লোকজন তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সরকার থেকে টাকা দিলেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেবে।
তিনি বলেন, গ্রাহকরা তাঁদের টাকা ফেরত পাবেন। তবে একটু সময় লাগতে পারে। ব্যাংক মার্জারের সময় সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আরও উন্নয়নমূলক প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। অবসায়ন হতে যাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকাও সরকার দ্রুত দিয়ে দেবে।
গ্রাহক আব্দুল মোমেন চৌধুরী বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, তারা আমার টাকাও দেয় না এবং মাসিক যে লাভ দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে। প্রাইম ফাইন্যান্সে টাকা রেখেছি পাঁচ বছর হবে। প্রথমে তিন বছরের জন্য টাকা রেখেছিলাম। পরে তারা টাকা ফেরত দিতে পারেনি। বলল আরও এক বছর রাখতে। পরে চার বছর হলো। এরপর তারা নিজেরাই আরও এক বছর টাকা নবায়ন করে নেয়। এমনকি সেপ্টেম্বর থেকে লাভ দেওয়াও বন্ধ করে দিল।
তিনি বলেন, অ্যাভিভার কাছেও টাকা আছে। তারাও টাকা ফেরত দিচ্ছে না। অ্যাভিভাও নভেম্বর থেকে লাভ দেওয়া বন্ধ করে দিল। আমি তখন তাঁদের একজন পরিচালককে ফোন করেছিলাম। তারা বলল, ফেব্রুয়ারি থেকে আপনাদের টাকা দেওয়া হবে। তারা টাকা তো দেয়নি, এমনকি টাকা চাইলে খারাপ ব্যবহার করে। প্রাইম ফাইন্যান্সের সিএফওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি দেখাও করেননি। আর অ্যাভিভার এমডির সঙ্গে দেখা করেছি। শেষবার তিনিও দেখা করেননি। আরও মিথ্যা কথা বলেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে গ্রাহক চৌধুরী বলেন, দুইটা কোম্পানির লোকজন বেতন নিচ্ছে, বোনাস নিচ্ছে, কিন্তু আমাদের টাকা দিচ্ছে না। আর এটা দেখার দায়িত্ব তো বাংলাদেশ ব্যাংকের। তারা এসব লোন নিজেদের লোকদেরকে দিয়ে এসব টাকা খেয়েছে। তারা দুর্নীতি করেছে।
আমাদের এই টাকা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো এদেরকে অবসায়ন করে দেওয়া এবং সরকার থেকে টাকা দেওয়া। কিন্তু সরকার তো ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ব্যস্ত। এখন খাব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি। আমি সারাজীবন সরকারের কাজ করেছি। ১৫ বছর রাষ্ট্রদূত ছিলাম। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে ছিলাম।
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স-২০২৫-এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি দেশে ব্যাংক ও এনবিএফআই সংকট মোকাবিলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। পরবর্তীতে ৩টি প্রতিষ্ঠানকে আরও কিছু দিন সময় দেওয়া হয়।
অবসায়নের তালিকায় থাকা ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো— ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। আর সময় পাওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো— বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই নয়টি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ১৫,৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের ৩,৫২৫ কোটি এবং ব্যাংক ও করপোরেট গ্রাহকদের ১১,৮৪৫ কোটি টাকা রয়েছে।
এএ