
ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয় এবং গভর্নর ব্যাংকটির স্মুথ (smooth) ব্যবসা পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাড়ে ১১টার দিকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান, বোর্ডের অন্যান্য সদস্য, ব্যাংকের এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান গভর্নরের কাছে পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পাওনার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং তা দ্রুত ফেরতের দাবি জানান। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কাছেও ব্যাংকটির পাওনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাবদ পাওনা রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া বড় ঋণগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা চাওয়া হয় এবং বিশেষ শর্তে প্রভিশনিংয়ে ছাড় দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়েও গভর্নরের কাছে পরামর্শ চেয়েছে ব্যাংকটি।
গভর্নর এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনার কথা জানান এবং দ্রুত কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে গভর্নর ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবসা পরিচালনায় কী কী বাধা রয়েছে, তা জানতে চান। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বিষয়গুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শিগগিরই করণীয় জানানো হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
এর আগে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আবদুল জলিলকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে হিসাববিদ এস এম আবদুল হামিদকে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ সময়ে ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকটিকে বড় সংকটে ফেলে।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশত্যাগ করেন। পুনর্গঠিত পর্ষদে সদস্য করা হয় মো. আবদুল জলিলকে।
এটি ছিল ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডের সঙ্গে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে প্রথম বৈঠকে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংক একসময় খুবই ভালো ব্যাংক ছিল, তবে মাঝখানে গভর্ন্যান্সে ঘাটতি দেখা গেছে। ব্যাংকটিকে ভালো অবস্থায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের সহায়তা করবে।
সেই বৈঠকে তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ইসলামী ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি অনুগত ছিল। এখন এই ব্যাংক কোনো গ্রুপ, দল বা পরিবারের হয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শেয়ার মালিকানার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
এর মধ্যে চারটি ব্যাংক থেকে কাগুজে ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে ৯৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে প্রভাব খাটিয়ে সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এসব ঋণ গ্রহণ করেন।
এএ