
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের পুনর্বহালের দাবি তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দলীয় এক সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় চট্টগ্রাম ১৬ (বাঁশখালী) আসনের সংসদ সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম এ দাবি জানান।
সংসদ সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে যেখানে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক, যেখানে বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান চাপ জাতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কিছু ব্যাংক কর্মকর্তাকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ঘটনাকে তিনি অমানবিক হিসেবে উল্লেখ করেন জানান, চাকরি হারানো এসব কর্মকর্তাদের অনেকেই নতুন করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার বাইরে চলে গেছেন, ফলে তারা মারাত্মক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়েও তারা কোনো উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছেন না, যার ফলে তাদের সামাজিক অবস্থান ও জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই মানবিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা জরুরি। দেশে যেখানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আগেই বেশি, সেখানে এই ধরনের চাকরিচ্যুতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য জানান, অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিখিত পরীক্ষার আগেই ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলেন। আবার অনেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে ব্যাংকিং খাতে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের এই অবস্থান অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান- এ মুহূর্তে চাকরিচ্যুতদের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোন সিদ্ধান্ত আছে কিনা? এ মানবিক বিষয়ে দৃষ্টি দেবেন কি-না?
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগতভাবেও তিনি বিষয়টি নিয়ে সহানুভূতিশীল, কারণ তার নিজ এলাকাতেও অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এসব চাকরিচ্যুতির পেছনে নানা কারণ রয়েছে, তবে সেগুলো সংসদে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি জনমত বা ধারণার কথাও তিনি উল্লেখ করেন—কিছু ব্যাংকের মালিকরা নিজেদের লোকজনকে রাখার জন্য অন্যদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে তিনি জানান, পুরো ঘটনাটি নিয়ে একটি দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
গত রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে অন্তবর্তী সরকারের সময়ে ইসলামী ধারার ছয়টি ব্যাংকের কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন চাকরিচ্যুতরা। মানববন্ধন থেকে ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিক এস আলমের হাতে ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এই মানববন্ধন থেকে তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তাদের দাবিগুলো স্মারক আকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে মানববন্ধন শেষ হয়।
পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ইসলামী ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধংসের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে এক সমাবেশের আয়োজন করে ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয়ক পরিষদ।
ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ইসলামী ধারার ব্যাংক চট্টগ্রামভিত্তিক সাবেক লুটেরা ব্যবসায়ী এস আলমের হাতে তুলে না দেওয়ার দাবি জানায় ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয়ক পরিষদ। একইসঙ্গে ব্যাংক লুটেরাদের পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে যে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে বলে দাবি জানানো হয়।
আজকে সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলামের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয়ক পরিষদের বক্তব্য জানতে চাইলে সংগঠনটির নেতা শামিম হাসানাইন বলেন, সংসদ সদস্য যে বক্তব্য দিয়েছেন এটা মূলত তার এলাকার কিছু মানুষের তোপ থেকে বাঁচতে দিয়েছেন। উনি নির্বাচনের আগেও ভোটব্যাংক হিসেব করে এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ তিনি অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া চাকরিচ্যুতদের পক্ষে সংসদে একটি বক্তব্য দিয়েছেন।
সরকার যদি চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল করে সেক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কি হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নীলক্ষেত থেকে সনদ বানিয়ে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়াদের যদি সরকার আবার ফিরিয়ে আনে তাহলে ইসলামী ব্যাংকের সেবা মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা উঠে যাবে। স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সব জায়াগায় অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার মানসিকতা তৈরী হবে। মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সরকারের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে এস আলম ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহসহ ৬টি ব্যাংক দখল করার পর এসব ব্যাংকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ছাড়াই চট্টগ্রামের পটিয়া, বাঁশখালীর কয়েক হাজার লোককে নিয়োগ দেয়। অভিযোগ রয়েছে নিয়োগ পাওয়াদের সিংহভাগকেই সার্টিফিকেট এবং পরীক্ষা ছাড়াই সিভির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ক্ষেত্র বিশেষ এসব নিয়োগে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা করে লেনদেন হয়েছিল।
৫ আগস্টের পর এস আলম পালিয়ে গেলে এসব ব্যাংক পুনর্গঠন করা হয়। অবৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়াদের সক্ষমতা যাচাইয়ে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে। তবে এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন অধিকাংশ প্রার্থী। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই শেষে কয়েক হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এএ