
নীতিগত সংস্কার ও তারল্য সহায়তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত মার্চ মাসের স্থবিরতা ও মন্দাভাব কাটিয়ে এপ্রিল মাসে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরে এসেছে। এপ্রিলে ডিএসইর লেনদেন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি, পাশাপাশি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে প্রধান মূল্যসূচকও। বিশেষ করে বিমা ও প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মার্চ ও এপ্রিল মাসের সর্বশেষ পুঁজিবাজার বিশ্লেষণ সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদনগুলোর তুলনামূলক চিত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ডিএসইর মোট লেনদেনের সিংহভাগই ছিল নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতের দখলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে বিমা খাত। মাসজুড়ে হওয়া মোট লেনদেনে এই খাতের অবদান ছিল ১৬.০৩ শতাংশ। বিমা খাতের ঠিক পরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ও লেনদেন আকর্ষণ করেছে ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল খাত। এপ্রিলের মোট টার্নওভারে এই খাতের অংশ ছিল ১৪.৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, বাজারের মোট লেনদেনের প্রায় ৩০.৫ শতাংশই ছিল এই দুই খাতের দখলে।
মার্চ বনাম এপ্রিল: লেনদেনে বড় চমক
মার্চ মাসে পুঁজিবাজারে এক ধরনের তারল্য খরা দেখা দিয়েছিল। পুরো মার্চ মাস জুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০২.১৫ বিলিয়ন টাকা। তবে এপ্রিল মাসে সেই খরা কেটে বাজারে বড় চমক দেখা যায়। এপ্রিল মাসে ডিএসইতে মোট ১৭১.৯৮ বিলিয়ন টাকার শেয়ার ও সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়, যা মার্চ মাসের তুলনায় ৬৮.৩৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, গত বছরের একই সময়ের (এপ্রিল ২০২৫) তুলনায় এই লেনদেন রেকর্ড ১৪০.১৬ শতাংশ বেড়েছে।একই সাথে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে বাজারের মূল সূচকও। মার্চ ২০২৬ শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক (ডিএসইএক্স) যেখানে ছিল ৫,১৭৮.৪২ পয়েন্ট, তা এপ্রিল শেষে ২.১০ শতাংশ বা ১০৮.৪৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫,২৮৬.৮৭ পয়েন্টে থিতু হয়েছে।
কেন ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত বড় মূলধনী শেয়ারের চেয়ে মাঝারি ও ছোট মূলধনী শেয়ারের প্রতি সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেশি থাকায় এই দুই খাতে লেনদেনের গতি বেড়েছে। তা ছাড়া, বিমা ও প্রকৌশল খাতের বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার দর তুলনামূলক কম থাকায় এবং এগুলোতে ডে-ট্রেডিং বা স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তোলার সুযোগ বেশি থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরাও এপ্রিল মাসে এই দুই খাতে বেশি সক্রিয় ছিলেন। এর ফলে সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার হাতবদলের গতি বা তারল্য পরিমাপক সূচক ‘টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও’ (টিভিআর) এক লাফে ৩০.১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা মার্চ মাসে ছিল মাত্র ১৭.৮০ শতাংশ।
অন্যান্য খাতের চিত্র
শীর্ষ দুটি খাতের বাইরে অন্যান্য খাতের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১২.২৭ শতাংশ লেনদেন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ওষুধ ও রসায়ন (ফার্মাসিউটিক্যালস অ্যান্ড কেমিক্যালস) খাতে ১১.৪৯ শতাংশ এবং বস্ত্র (টেক্সটাইল) খাতে ১০.৯৬ শতাংশ লেনদেন রেকর্ড করা হয়েছে।বাকি খাতগুলোর মধ্যে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক (ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড) খাতে ৬.৬৩ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ৪.৬০ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ (ফুয়েল অ্যান্ড পাওয়ার) খাতে ৩.৬২ শতাংশ এবং সেবা ও আবাসন (সার্ভিসেস অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট) খাতে ২.৩৮ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বিবিধ খাতের ঝুলিতে গেছে মোট লেনদেনের ১৭.৫৬ শতাংশ।
মূলধনের কাঠামো ও বন্ডের আধিপত্য
লেনদেনের ক্ষেত্রে বিমা ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের আধিপত্য থাকলেও, ডিএসইর মূলধনী কাঠামোতে এখনো একচ্ছত্র রাজত্ব ধরে রেখেছে সরকারি বন্ড। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিএসইর ৪,৬২০.০০ বিলিয়ন টাকার মোট ইস্যুকৃত মূলধনের মধ্যে ৭৭.৬৩ শতাংশই বাংলাদেশ সরকারের ট্রেজারি বন্ড (বিজিটিবি)। বাণিজ্যিক খাতের মধ্যে ব্যাংকের অবদান মাত্র ৯.৩৮ শতাংশ।অন্যদিকে, মোট বাজার মূলধনের ক্ষেত্রেও সরকারি বন্ড সর্বোচ্চ ৪৯.৭৮ শতাংশ অবদান রাখছে। বাণিজ্যিক খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক (১০.৬১%), ওষুধ ও রসায়ন (৮.০৯%) এবং টেলিকমিউনিকেশন (৭.৩৯%) খাত।
পলিসি সংস্কারের প্রভাব
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গত ১১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সরকারি ট্রেজারি বন্ড লিয়েন বা বন্ধক রেখে ফেস ভ্যালুর সর্বোচ্চ ৭৫% পর্যন্ত ওভারড্রাফট বা টার্ম লোন নেওয়ার যে সার্কুলার জারি করা হয়েছিল, তা এপ্রিল মাসে এসে বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ধরনের নীতিগত সংস্কারের প্রত্যক্ষ সুফল পেয়েছে বিমা ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো দ্রুত লেনদেনযোগ্য খাতগুলো। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগকারীদের শুধু নির্দিষ্ট কিছু খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এএ