
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধারাবাহিক বাড়ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ। তবে এপ্রিলে এসে মানুষের হাতে থাকা টাকা আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আর পরের মাস এপ্রিলে সেটা কমে দাড়িয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে কমেছে ছাপানো টাকা (রিজার্ভ মানি) এবং বাজারে প্রচলিত টাকার (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) পরিমাণও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর কিছু ব্যাংকের প্রতি আস্থার অভাবে মানুষ হাতে নগদ টাকা রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করছিল। মানুষ টাকা বেশি দিন হাতে রাখে না। এখন হয়তো আস্থাশীল অন্য কোনো ব্যাংকে আবার টাকা রাখছে। এর ফলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকা কিছু কমেছে। আর ব্যাংকের বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত নগদ অর্থ থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি পরিচালনাকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, তারল্য এবং ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছিল। জানুয়ারিতে এটি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা এবং মার্চে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে পরের মাস এপ্রিলে এসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি ১ লাখ টাকা।
মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পর যা আর ব্যাংকে ফেরত আসে না, তা-ই ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে মানুষের হাতে রাখা টাকা। যেটার ধারাবাহিকতা চলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পরের মাস মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ আবার বেড়ে যায়। এরপর এপ্রিলে এসে সেটা আবার কমে। এরপর মে মাস থেকে জুন পর্যন্ত আবার বাড়ে। জুলাই থেকে সেটা আবার ধারাবাহিক নভেম্বর পর্যন্ত কমছিল।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ ব্যাংকে রাখা টাকা তুলে নিয়ে বাসায় রাখতেন। এতে করে ব্যাংকগুলোতে দেখা দিয়েছিল চরম তারল্য সংকট। এমন অবস্থায় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করে। কিন্তু এতেও কাজে আসেনি। প্রতি মাসেই বাড়ছিল মানুষের হাতে নগদ টাকা তথা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মানুষের হাতে নগদ টাকা বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। তবে ওই বছর ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করে।
সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিলে মানুষের হাতে নগদ টাকা কমেছে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি ১ লাখ টাকা। মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর পরের মাস এপ্রিলে এটা কমে দাড়িয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই মানুষের হাতে নগদ বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ কমতে থাকে। ওই বছরের আগস্টে মানুষের হাতে বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ, পরের মাস অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস নভেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস ডিসেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি ৫ লাখ, গত বছরের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ এবং ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। আর ২০২৪ সালের মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকা, এপ্রিলে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর মে মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ জুন মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা, পরের মাস জুলাইয়ে আবার কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা, আগস্টে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি ২ লাখ টাকা, অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭ লাখ টাকা, নভেম্বরে কমে দাড়ায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি ২ লাখ টাকা এবং ডিসেম্বরে বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি ৪ লাখ টাকা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেটা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি ১ লাখ টাকা, মার্চে বেড়ে দাড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং এপ্রিলে কমে দাড়ায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।
তথ্য মতে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক কমছিল ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। কিন্তু নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করে। যেটা ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে সেটা বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬০ কোটি, জানুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৯৫ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ কোটি, মার্চে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৯৫ কোটি, এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, মে মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, জুনে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩৬ কোটি, জুলাইয়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি ও আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দশ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছিল ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।
এদিকে, মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমার সাথে সাথে কমছে ছাপানো টাকা (রিজার্ভ মানি) এবং বাজারে প্রচলিত টাকার (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) পরিমাণও।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের মার্চে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি (রিজার্ভ মানি) ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। আর পরের মাস এপ্রিলে ছাপানো টাকা কমে দাড়ায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে মার্চের তুলনায় এপ্রিলে ছাপানো টাকা কমেছে ৭ হাজার ৮৬২ কোটি ৪ লাখ টাকা।
এছাড়া, চলতি বছরের এপ্রিলে বাজারে প্রচলিত টাকা (কারেন্সি ইনসার্কুলেশন) কমে দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এর আগে মার্চে বাজারে প্রচলিত টাকার (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে কমেছে ১১ হাজার ৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা।
একই সঙ্গে ধারাবাহিক বাড়ছে ছাপানো টাকার (রিজার্ভ মানি) পরিমাণও। চলতি বছরের মার্চ শেষে ছাপানো টাকার (রিজার্ভ মানি) দাড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। যেটা আগের ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা।
এএ