
দেশে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও বাড়ছে ভোক্তা ঋণ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ব্যাংক খাতে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে । উচ্চ ঋণসুদ ও স্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে শুরু হওয়া ঊর্ধ্বমুখী ধারা এ সময়েও বজায় ছিল।
এর অর্থ, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যয় মেটাতে পরিবারগুলো ক্রমেই ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ভোক্তা ঋণের চাহিদাও শক্তিশালী রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ভোক্তা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। তবে চলতি বছরের মার্চ শেষে এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া, এক বছরের ব্যবধানেও ভোক্তা ঋণ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা।
সর্বশেষ প্রান্তিকভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে আবাসন, বেতননির্ভর ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, জমি কেনা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি।
তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ঋণ বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
একই সময়ে বেতননির্ভর ঋণ বেড়ে ২৩ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ২২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণ বেড়ে ১৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এতে স্বল্পমেয়াদি ভোক্তা ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।
জমি কেনার ঋণ তৃতীয় প্রান্তিকে বেড়ে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৬ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। একই সময়ে মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনার ঋণ বেড়ে ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগে ছিল ৬ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও অন্যান্য সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ ধরনের ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ২২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা
চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের ঋণ বেড়ে ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ড তহবিলের বিপরীতে ঋণ বেড়ে ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগে ছিল ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণও বেড়ে ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগে ছিল ২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।
তবে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর ও কম্পিউটারসহ গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার ঋণ সামান্য কমেছে। এ ধরনের ঋণ নেমে এসেছে ৩৪ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকায়, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, ভোক্তা ঋণ এখন আর শুধু গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে অনেক গ্রাহক এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে, ভ্রমণ এবং পেশাগত ব্যয় নির্বাহের জন্যও এ ধরনের ঋণ নিচ্ছেন।
তাঁদের মতে, তুলনামূলক উচ্চ ঋণসুদ থাকা সত্ত্বেও চাহিদা স্থিতিশীল থাকায় ব্যাংকগুলোও ভোক্তা ঋণের পরিধি বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, স্বল্প অঙ্কের ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা ভোক্তা ঋণের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, “বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দুর্বল গতি এবং ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় করপোরেট ঋণ সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা অর্থায়নের দিকে বেশি ঝুঁকছে। কারণ এ ধরনের ঋণ দ্রুত বিতরণ করা যায় এবং ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।”
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ভোক্তা ঋণ স্বল্পমেয়াদে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে।
তাঁদের মতে, ব্যাংকঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে ক্রমাগত ভোগ ব্যয়ের দিকে বেশি প্রবাহিত হয়, তাহলে তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এএ