
বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চীন আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ থেকে কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল—বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চীনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল সহযোগিতার আড়ালে একটি বড় বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি।
অর্থনীতির ভাষায় বাণিজ্য ঘাটতি সবসময় নেতিবাচক নয়। দ্রুত শিল্পায়নশীল দেশগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও কাঁচামাল আমদানির কারণে ঘাটতির মুখোমুখি হয়। কিন্তু যখন সেই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং রপ্তানি তার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়, তখন তা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্ক ঠিক সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৮.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দেশের মোট আমদানির প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৪২.৫ মিলিয়ন ডলার। আগের দুই অর্থবছরেও রপ্তানি ৭০০ মিলিয়ন ডলারের আশপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি বর্তমানে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ২০২০ সালে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (DFQF) সুবিধা প্রদান করে এবং পরবর্তীতে প্রায় সব বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বাজারে প্রায় শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি কেন এক বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারছে না—এটাই এখন মূল প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ। বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানির একটি বড় অংশ এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে যে পণ্য উৎপাদনে চীন নিজেই বিশ্বনেতা, সেই পণ্য দিয়েই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় অংশীদারিত্ব অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়।
অন্যদিকে চীনের আমদানির প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার মধ্যেও বড় ধরনের অমিল রয়েছে। বর্তমানে চীন বছরে প্রায় ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি পণ্য আমদানি করে। তাদের আমদানির তালিকায় রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত রাসায়নিক পণ্য, কৃষিজাত খাদ্য, সামুদ্রিক খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী, ভোক্তা পণ্য এবং শিল্প কাঁচামাল। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত পোশাক, পাট, চামড়া ও সীমিত কিছু কৃষিপণ্যের মধ্যেই আবদ্ধ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বা অশুল্ক বাধা। অনেক সময় শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও পণ্য বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন হয় কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য সনদ, ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেশন, ট্রেসেবিলিটি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার সুবিধা। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, মাছ, ফলমূল ও খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর। বাংলাদেশের অনেক উৎপাদক এখনও সেই মান পূরণে সক্ষম নয়। ফলে বাজারসুবিধা থাকলেও বাস্তবে রপ্তানি বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শিল্প কাঠামোর আরেকটি বাস্তবতা হলো চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গভীর নির্ভরতা। দেশের পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাপড়, সুতা, রাসায়নিক দ্রব্য, ডাইস, শিল্পযন্ত্র, যন্ত্রাংশ এবং ইলেকট্রনিক উপাদানের বড় অংশই চীন থেকে আসে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল বা এপিআইয়ের ক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন থেকে আমদানিও বাড়ছে। ফলে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও সমান্তরালভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে এই বাস্তবতা সত্ত্বেও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কি না।
প্রথমত, এখন সময় এসেছে একটি পৃথক “চীন রপ্তানি কৌশল” প্রণয়নের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের জন্য যে কৌশল কার্যকর, চীনের ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয়। চীনা ভোক্তাদের চাহিদা, জীবনধারা, ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজার কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই চীনের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় ২০ থেকে ৩০টি পণ্য চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশি আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, আলু, চিংড়ি, কাঁকড়া, সামুদ্রিক মাছ, পাটজাত পরিবেশবান্ধব পণ্য, সিরামিক, চামড়াজাত জুতা, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি আম চীনের বাজারে প্রবেশের অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এটি সফল হলে অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, চীনা বিনিয়োগকে রপ্তানি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই দশকে ভিয়েতনাম চীনা, জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করে নিজেকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের চীনে রপ্তানি ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর বড় অংশই বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর উৎপাদন।
বাংলাদেশেও প্রায় দুই হাজার চীনা কোম্পানি বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে সীমাবদ্ধ। এখন প্রয়োজন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক টেক্সটাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক উৎপাদন শিল্পে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। ‘বাই-ব্যাক’ মডেলে চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে উৎপাদন করে নিজেদের বিতরণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনে রপ্তানি করলে রপ্তানি দ্রুত বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল বাণিজ্য ও ই-কমার্সকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে চীনের খুচরা বাণিজ্যের একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক। বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স বাজার হিসেবে চীনে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি হয়। কিন্তু বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থিতি সেখানে প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারি বাণিজ্য মিশন, দূতাবাস এবং রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে চীনের বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য, হস্তশিল্প ও ভোক্তাপণ্যের জন্য এটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
চতুর্থত, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করতে হবে। শুধু জমি বরাদ্দ দিলেই বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা চান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দক্ষ বন্দরসেবা, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, স্থিতিশীল নীতিমালা এবং সহজ মুনাফা প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে বাংলাদেশকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও উন্নত করতে হবে।
পঞ্চমত, এলডিসি উত্তরণের পর চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নিতে হবে। এলডিসি সুবিধা দীর্ঘদিন বহাল থাকবে না। ফলে ভবিষ্যতে বাজারসুবিধা ধরে রাখতে এফটিএ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় সংবেদনশীল খাতগুলোকে সুরক্ষা দিতে হবে। নেগেটিভ লিস্ট, সেফগার্ড ব্যবস্থা এবং পর্যায়ক্রমিক শুল্ক হ্রাসের মতো কৌশল ছাড়া এফটিএ দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ষষ্ঠত, রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা শুধু নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাই কমায় না, বৈশ্বিক ঝুঁকির প্রতিও অর্থনীতিকে অরক্ষিত করে তোলে। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, সাইকেল, প্লাস্টিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে নতুন প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে কেবল বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। চীন বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী, প্রযুক্তির উৎস এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ অংশীদার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার পেছনেও সাশ্রয়ী মূল্যের চীনা কাঁচামালের বড় অবদান রয়েছে।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন থেকে আমদানি কমানো নয়; বরং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা। বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রপ্তানি বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা।
চীনের বাজারের দরজা বাংলাদেশের জন্য খোলা আছে—কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক পণ্য, আন্তর্জাতিক মান, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং, কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প কৌশল। আগামী এক দশকে যদি বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি ৭৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তীতে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়, তাহলে এখনই একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও ফলাফলমুখী ‘চীন অর্থনৈতিক কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বৃহত্তম বাজারগুলোর একটিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে, আর বাণিজ্য ঘাটতির ব্যবধান ক্রমেই আরও বিস্তৃত হবে।
লেখক : মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com