
আস্থাহীন পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর কঠিন চ্যালেঞ্জে বিএসইসি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাজার কারসাজি, ২০১০ সালের ধসের ক্ষত, নিয়ন্ত্রণহীন মার্জিন ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নীতিগত অস্থিরতা এবং মানসম্মত কোম্পানির স্বল্পতায় দেশের পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে। নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সংস্কার পরিকল্পনা নয়, কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই পুঁজিবাজার আবারও শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎসে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত কিংবা চীনের মতো দেশগুলোতে হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।
কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর ঋণনির্ভরতা অত্যধিক হলেও পুঁজিবাজার এখনও অর্থনীতির প্রান্তিক অংশ। শিল্পোদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ বাজারে আসতে আগ্রহী নন, আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ পুঁজিবাজারকে নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে দেখেন না।
প্রশ্ন হচ্ছে এই আস্থাহীনতার জন্য কে দায়ী? এবং কী করলে পুঁজিবাজার সত্যিকার অর্থে শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে?
বিএসইসি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদার, করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা, নেগেটিভ ইকুইটি ও মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় কর্মপরিকল্পনা, এসএমই ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থা চালু, বিনিয়োগকারী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজার সংস্কারে টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে।
অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর চেষ্টা নয়, সুশাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। তাঁর মতে, বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, বিএসইসির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে বাজারে আনা, দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, আইপিও অনুমোদনে কঠোর যাচাই, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দক্ষ জনবল দিয়ে বিএসইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাঁর ভাষায়, "সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে নয়, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে বাজারে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও গুজবনির্ভর লেনদেনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন,তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা, সময়মতো তথ্য প্রকাশ এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে নীতিগত প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে।
সাইফুল ইসলামের মতে, বাজারের তারল্য বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করলে পুঁজিবাজার দেশের শিল্পায়নের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থায়নের উৎসে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, সূচকের সাময়িক ঊর্ধ্বগতি নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক বাজারই বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।
ডিবিএ’র সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী বলেন, পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট মূলধনের নয়, আস্থার। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রথমেই বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং বা অসাধু চক্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন,বাজারে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য।
আহমেদ রশীদ লালীর মতে, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তাই বিএসইসিকে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শিল্পায়নকে গতিশীল করতে পুঁজিবাজারকে ব্যাংকঋণের বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য করপোরেট বন্ড বাজার, এসএমই প্ল্যাটফর্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গভীর পুঁজিবাজারই দেশের টেকসই শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর বিষয়ে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খন বলেন, একটি আধুনিক ও গতিশীল অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং দক্ষ পুঁজিবাজার। এটি কেবল বিনিয়োগের ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়নকে সচল রাখার প্রধান সেতু। তবে এই বাজারের মূল জ্বালানি হলো 'বিনিয়োগকারীদের আস্থা'। বিগত সময়ে নানা অনিয়ম ও সুশাসনের অভাবে সাধারণ মানুষ যে আস্থা হারিয়েছেন, তা রাতারাতি ফেরানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অবশ্যই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন,আস্থা ফেরাতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে বাজারে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে 'শূন্য সহনশীলতা'নীতি বজায় রাখা। আমরা এমন একটি বাজার তৈরি করতে চাই যেখানে নিয়ম ভঙ্গকারী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে। কোনো নামসর্বস্ব বা দুর্বল কোম্পানি যাতে কৃত্রিম উপায়ে বাজারে এসে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা হাতিয়ে নিতে না পারে, সে জন্য আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।
মাসুদ খান আরও বলেন,কারসাজিকারীদের কঠোর শাস্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের গভীরতা বাড়াতে আমরা বন্ড মার্কেট এবং ভালো মিউচুয়াল ফান্ডের দিকে নজর দিচ্ছি। একই সাথে, মার্জিন ঋণের কারণে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যাতে আর সর্বস্বান্ত না হন, সে জন্য যুগোপযোগী সংস্কার ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ করা হবে। বিএসইসি কোনো মহলের চাপে নয়, সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করবে। আমরা যখন নিয়মের শাসন ও জবাবদিহিতা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারব, বিনিয়োগকারীরা যখন নিয়মিত ন্যায্য লভ্যাংশ পাবেন, তখনই বাজারে প্রকৃত আস্থা ফিরে আসবে।
এএ