
থাইরয়েড শরীরে হরমোন উৎপাদনের মাধ্যমে বিপাকক্রিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করলে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং বেশি হরমোন উৎপাদন করলে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে।
থাইরয়েডজনিত সমস্যার অনেক লক্ষণকে অনেক সময় মানসিক চাপ, বয়সজনিত পরিবর্তন বা অন্যান্য সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। তবে শরীরে কিছু পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে দেখা দিলে থাইরয়েড পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। জেনে নিন থাইরয়েড সমস্যার ৯টি সম্ভাব্য লক্ষণ।
১. হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া
খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন না হলেও হঠাৎ ওজন বেড়ে বা কমে গেলে তা থাইরয়েড সমস্যার একটি ইঙ্গিত হতে পারে। থাইরয়েড হরমোন কম উৎপাদিত হলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে ওজন বাড়তে পারে। অন্যদিকে, থাইরয়েড অতিসক্রিয় হলে স্বাভাবিক বা বেশি ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে যেতে পারে।
তবে শুধু ওজনের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে থাইরয়েডের সমস্যা নির্ণয় করা ঠিক নয়। এর পেছনে অন্যান্য কারণও থাকতে পারে।
২. সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভব করা
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্তি ও শক্তিহীনতা অনুভূত হয়, তবে সেটি হাইপোথাইরয়েডিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়, ফলে নিস্তেজতা ও কাজে মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে।
তবে রক্তস্বল্পতা, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাবসহ বিভিন্ন কারণেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি হতে পারে।
৩. অস্বাভাবিক ঠান্ডা বা গরম লাগা
আশপাশের মানুষ স্বাভাবিক অনুভব করলেও আপনার যদি অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগে, সেটি হাইপোথাইরয়েডিজমের একটি লক্ষণ হতে পারে। বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে গেলে শরীরে তাপ উৎপাদনও কমে যায়।
অন্যদিকে, হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম লাগতে পারে এবং অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে।
৪. হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন
থাইরয়েড হরমোন হৃদস্পন্দনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। থাইরয়েড অতিসক্রিয় হলে দ্রুত হৃদস্পন্দন, বুক ধড়ফড়, উদ্বেগ ও ঘামের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আবার থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে হৃদস্পন্দনের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। ঘন ঘন বুক ধড়ফড়, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর মতো সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়া
থাইরয়েডের সমস্যা চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির চক্রকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চুল ঝরে পড়তে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ভ্রুর বাইরের অংশও পাতলা হতে পারে।
তবে পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন বা কিছু ওষুধের কারণেও চুল ঝরে যেতে পারে।
৬. ত্বক শুষ্ক হওয়া বা ঘামের পরিবর্তন
হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ বা খসখসে হয়ে যেতে পারে এবং ঘাম কম হতে পারে। বিপরীতে, হাইপারথাইরয়েডিজমে ঘাম বেড়ে যেতে পারে এবং ত্বক উষ্ণ ও আর্দ্র অনুভূত হতে পারে।
ত্বকের এমন পরিবর্তনের সঙ্গে থাইরয়েডের অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘন ঘন মলত্যাগ
থাইরয়েড হরমোন হজম প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে হজমের গতি ধীর হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, অতিসক্রিয় থাইরয়েড হজম প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে তুলতে পারে। ফলে ঘন ঘন মলত্যাগ বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৮. মেজাজ ও মনোযোগে পরিবর্তন
থাইরয়েডের সমস্যা মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। হাইপোথাইরয়েডিজমে মনমরা ভাব, ধীর চিন্তা, মনোযোগের অভাব এবং কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, হাইপারথাইরয়েডিজমে উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা ও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৯. মাসিক চক্রে পরিবর্তন
থাইরয়েড হরমোন প্রজননতন্ত্রের কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে থাইরয়েডের সমস্যায় মাসিক চক্রে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত বা ঘন ঘন মাসিক হতে পারে। আবার থাইরয়েড অতিসক্রিয় হলে রক্তপাতের পরিমাণ কমে যেতে পারে বা মাসিকের নিয়মে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলেই থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
বিএইচ