
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে চাকরিপ্রার্থীর বদলে ‘চাকরিদাতা’ বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে একটি বড় ধরনের নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম পর্যায়ে ৮টি বিভাগের ৮টি জেলার মোট ৬৪টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সুবিধার বিশেষ দিক হলো—মোট বরাদ্দের অর্ধেক টাকা পাওয়া যাবে জামানতহীন ব্যাংক ঋণ হিসেবে এবং বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস্ ডিপার্টমেন্ট থেকেও "উদ্যোগ (UDYOG): উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি" শীর্ষক একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তবে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে দেশের এই তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাতের সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। তাই এখনই সঠিক সময় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার। এ জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বেশি কর্মমুখী ও পেশাভিত্তিক করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে শুরু থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা নিয়ে তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসী তরুণদের রেমিট্যান্সসহ সামগ্রিক তরুণ সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। এই তরুণদের উদ্ভাবনী সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীরা একযোগে কাজ করবে।
ব্যাংক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি অর্থায়ন
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে "উদ্যোগ” কোনো প্রচলিত মেধা যাচাই প্রতিযোগিতা নয়। এটি মূলত একটি ধারাবাহিক ব্যাংক অর্থায়ন কর্মসূচি। এর আওতায় তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করবে। ব্যাংক কর্মকর্তারা উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ধারণা এবং তাদের প্রকৃত মূলধনের চাহিদা সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে অর্থ ছাড় করবেন। নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত একজন তরুণ তাঁর মূল চাহিদার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ পাবেন। এই প্যাকেজের ঠিক অর্ধেক দেওয়া হবে ঋণ হিসেবে এবং বাকি অর্ধেক সম্পূর্ণ অনুদান। এই ঋণের ওপর গ্রাহক পর্যায়ে সুদের বা মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ শতাংশ। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই অর্থায়নের বিপরীতে কোনো প্রকার স্থাবর সম্পত্তি বা সহায়কা জামানত (ক্ল্যাটারাল) দিতে হবে না।
তবে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে কোনো উদ্যোক্তা ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁর প্রাপ্ত অনুদানের অংশটি সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী ওই হিসাবটি শ্রেণীকৃত করে উদ্যোক্তাকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, যার ফলে তিনি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাত থেকে আর কোনো ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা রাখবেন না।
কারা পাবেন এই সুবিধা
এই অর্থায়ন সুবিধার জন্য আবেদনকারীর বয়স হতে হবে অনূর্ধ্ব ২৮ বছর এবং তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। পূর্বে ব্যবসা পরিচালনার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলেও এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে; তবে আবেদনকারীর একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবায়নের যোগ্য ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে।
উৎপাদন ও সেবামূলক খাতের একটি বিস্তৃত পরিসরকে এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য চাষ, পশুপালন, পর্যটন, সেবামূলক খাত কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক যেকোনো বৈধ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। আবেদন ফরম সংশ্লিষ্ট উপজেলায় অবস্থিত যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যাবে।
প্রথম ধাপে ৮টি জেলা, লক্ষ্য বছরে ৫ হাজার উদ্যোক্তা
প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের নির্বাচিত ৮টি জেলায় এই পাইলট প্রকল্প শুরু হচ্ছে। জেলাগুলো হলো— মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোণা। এসব জেলার মোট ৬৪টি উপজেলার প্রতিটিতে ১০ জন করে প্রথম দফায় সর্বমোট ৬৪০ জন সম্ভাবনাময় তরুণকে বাছাই করা হবে।
এই ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে কেবল অর্থায়নেই সীমিত রাখা হবে না, বরং তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক টেকসই নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং এবং বাজার সংযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রতিটি জেলার সব উপজেলায় এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি বছর দেশে ৫ হাজার করে নতুন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা।
প্রশিক্ষণ, বিপণন ও সার্কুলারের সময়সূচি
আর্থিক সহায়তার বাইরে নির্বাচিত উদ্যোক্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ পাবেন। ব্যবসায়িক ঝুঁকি মোকাবিলা ও সঠিক পরিচালনার জন্য তাঁদের অভিজ্ঞ মেন্টর বা পরামর্শকের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি নিয়ম মেনে ব্যবসা নিবন্ধন, পেশাদার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি এবং তাঁদের তৈরি পণ্য বাজারে বিক্রির জন্য ‘মার্কেট লিঙ্ক’ বা বাজার সংযোগের সুযোগ করে দেবে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব করে দেখেছে, দেশে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করলে গড়ে তাঁর অধীনে ৩ থেকে ৫ জন মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ফলে ৬৪০ জন উদ্যোক্তা তৈরি হলে শুরুতেই কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, যা দারিদ্র্য দূরীকরণ ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বড় অবদান রাখবে।
কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা সংবলিত সার্কুলার আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলার প্রকাশের দিন থেকে পরবর্তী এক মাস পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ের ব্যাংক শাখাগুলোতে তরুণদের আবেদন জমা নেওয়া হবে।