
দেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজার চালুর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার প্রস্তুতের কার্যক্রমে গতি আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সদস্যভুক্ত সাতটি ব্রোকারেজ হাউজ এ ধরনের ব্রোকারের লাইসেন্স পেতে কমিশনে আবেদন করেছে। নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ, বি-রিচ, সোহেল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ, রয়েল ক্যাপিটাল, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ এবং ন্যাশনাল লাইফ সিকিউরিটিজ। এর বাইরে আরও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ আবেদন করতে পারে। আলোচনায় রয়েছে পিএসপি স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ, ওয়ান লিমিটেড এবং রেমনস ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের নাম। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যোগ্যতা পূরণকারী সাতটি ব্রোকারকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শুরুতে গোল্ড ও সিলভার নিয়ে ক্যাশ সেটেলমেন্ট কন্ট্রাক্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হলে ফিজিক্যাল ডেলিভারির সুযোগও চালু করা হবে।
প্রথম ধাপে গোল্ড-সিলভার
কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে গোল্ড ও সিলভার দিয়ে কমোডিটি ডেরিভেটিভস কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে কপার, কটন ও ক্রুড পাম অয়েলের (সিপিও) মতো পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ফিজিক্যাল ডেলিভারি থাকবে না। ক্যাশ সেটেলমেন্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে চুক্তির মূল্য পার্থক্য নগদে নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট পণ্য হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে দামের পার্থক্যের ভিত্তিতে আর্থিক নিষ্পত্তি হবে।
পরবর্তী ধাপে ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য অনুমোদিত ওয়্যারহাউজ, পণ্যের মান ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
হেজিং হবে মূল লক্ষ্য
কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটকে নিছক স্পেকুলেটিভ বা জল্পনাভিত্তিক বাজারে পরিণত না করে হেজিং মার্কেট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএসইসি। মূল লক্ষ্য হবে কমোডিটির দামের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি কমাতে ব্যবসায়ীদের কার্যকর সুযোগ তৈরি করা।
আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, বড় কমোডিটি ট্রেডার, উৎপাদনকারী ও রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ বাজারে হেজার হিসেবে অংশ নিতে পারবে। ভবিষ্যতে পণ্যের দাম বেড়ে বা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি আগাম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা তাদের লোকসানের আশঙ্কা কমাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য সরাসরি বেশি মুনাফা করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ মূল্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। হেজারদের এ সুবিধা দিতে তুলনামূলক বেশি পজিশন লিমিট দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
২০০৭ সালের উদ্যোগের বাস্তবায়ন
দেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের শুরু ২০০৭ সালে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালে এ উদ্যোগ চূড়ান্ত নিবন্ধন পায়। ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (এমসিএক্স) ও পাকিস্তান মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের (পিএমইএক্স) অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেয় সিএসই।
বাজার চালুর প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচিং, অর্ডার ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করেছে সিএসই। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় মূল সিস্টেম এবং ভারতীয় ভেন্ডরের ডেরিভেটিভস সফটওয়্যার যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই বছরে প্রায় ২০০ ট্রেডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ১৫টি ব্রোকারেজ হাউজকে প্রস্তুত করা হয়েছে। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও এর মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বাজার চালুর আগে ব্রোকার লাইসেন্স, ট্রেডিং অবকাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ওয়্যারহাউজ ও অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা—সবকিছু কার্যকরভাবে প্রস্তুত করাই এখন নিয়ন্ত্রক ও এক্সচেঞ্জের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতে পণ্যের মূল্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি কার্যকর বাজার তৈরি হবে।