বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
গত বুধবার তিনি সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তার বিরুদ্ধে মূলত চীন ভ্রমণে আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাধীনভাবে তদন্ত করছে।
তবে সায়মা ওয়াজেদ তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভোটে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। একই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে প্রথম অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এর পর থেকে পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি অবৈতনিক ছুটিতেই ছিলেন।
তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক প্রতারণা, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্য প্রদান এবং বাংলাদেশে অবৈধভাবে একটি জমির প্লট অধিগ্রহণের অভিযোগ এনেছে। গত ৩ জুলাই তার আইনজীবীদের পাঠানো এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, জমির প্লটটি তিনি ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় অধিগ্রহণ করেছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘আমি আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম, যা আমি আন্তরিকতার সঙ্গে করে এসেছি।’
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ আরও লিখেছেন, ‘যেহেতু আপনি দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে আমাকে বাধা দিয়ে চলেছেন, তাই ডব্লিউএইচতে আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া আপনার বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এদিকে ডব্লিউএইচও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে আছেন। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে তার বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সংস্থাটি।
জুলাইয়ে ডব্লিউএইচওকে দেওয়া এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, নিয়মিত ভ্রমণ খরচ ফেরত পাওয়ার আবেদনপ্রক্রিয়া করতে গিয়ে একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি ঘটেছে। অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। এই যোগ্যতার বিষয়টি তিনি ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুসকে জানিয়েছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক পরিচালকরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। মহামারি বা রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে ডব্লিউএইচওর সার্বিক নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন করা তাদের প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশ ও ভারতসহ এই অঞ্চলের সদস্যদেশগুলো প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোটের মাধ্যমে তাদের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন করে।
এনজে