
‘ঐক্য-সমৃদ্ধির’ স্লোগানে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ডিআরইউ চত্বরে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। এতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।
সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। পরে ডিআরইউ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য দেন ডিআরইউর সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপকমিটির আহ্বায়ক এম এম জসিম এবং কার্যনির্বাহী সদস্য ও উপকমিটির সদস্যসচিব মাহফুজ সাদি।
র্যালি শেষে রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র অর্জনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যে সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবদমিত ছিল, কথা বলা ছিল পাপ, সরকারের বিরুদ্ধে যায়, এমন কথা বলা ছিল ঘোরতর অন্যায়, সেই সময়ে যতটুকু স্পেস পাওয়া গেছে, ডিআরইউর সাংবাদিকরা সেইটুকু প্রচার ও প্রকাশ করতে কখনো দ্বিধা করেননি।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপরও নানা ধরনের চাপ ছিল। অনেক সাংবাদিককে বিভিন্ন কালো আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় নিগৃহীত হতে হয়েছে। তাদের জেল-জুলুমও সহ্য করতে হয়েছে।
রিজভী বলেন, এই পরিসর ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আজ আমরা একটি মুক্ত পরিবেশ পাচ্ছি। এখানে সবাই থাকবে। যারা সরকারে আছেন, সরকারের বাইরে যারা আছেন এবং বিরোধী দলে যারা আছেন, তারা মুক্ত কণ্ঠে সমালোচনা করবেন। সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। এভাবেই একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে গণমাধ্যম।
এসময় স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, অনেকে মনে করেন রাজনীতিবিদদের কাজ সবচেয়ে কঠিন। কিন্তু তিনি মনে করেন, সাংবাদিকদের কাজ সবচেয়ে কঠিন।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা যখন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করবেন, তখন কোনো সমস্যা হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তার মধ্যে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সাংবাদিকদের যে নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে, ডিআরইউ তার ভেতর থেকেই কাজ করে। এ কারণে তিনি ডিআরইউকে পছন্দ করেন বলেও উল্লেখ করেন।
এসময় দেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে সংবাদমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ।
তিনি বলেন, আজকে আমরা যেখানে আছি, সংবাদমাধ্যম আছে বলেই সেখানে আছি। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে পর্যায়ে আমরা আছি, তার পেছনে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের যত অর্জন, তার বড় একটি অংশের কৃতিত্ব সংবাদমাধ্যমের।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের নিয়ে এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান উল্লেখ করে পার্থ বলেন, মন্ত্রী হওয়ার পর সাংবাদিকদের নিয়ে এটাই আমার প্রথম ফরমাল অনুষ্ঠান। এ কারণে আমি সত্যিই আনন্দিত। আপনাদের ধন্যবাদ।
স্বাধীন সাংবাদিকতায় সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে চায় না জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমাদের সময়ে আপনারা ফ্রি মিডিয়া পাবেন। আমাদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা নেই।
সরকার ও গণমাধ্যমকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার নীতিতে বিশ্বাস করেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে স্বপ্নের ও সোনার বাংলাদেশে পরিণত করা সম্ভব।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিআরইউর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সংগঠনটির ক্রীড়া কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ‘সিড মানি’ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সুস্থ ও সুন্দর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। সাংবাদিকদের মানসিক প্রশান্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে খেলাধুলার গুরুত্ব রয়েছে।
আমিনুল হক বলেন, ডিআরইউ দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
ডিআরইউর ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘সিড মানি’ দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য আরও দৃঢ় হবে। এ ক্ষেত্রে ডিআরইউর পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল প্রতিমন্ত্রীর এই আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সিড মানি’ পাওয়া গেলে সংগঠনের ক্রীড়া কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তারা আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলনে ছয় সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন। তাদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আমাদের দল জামায়াতে ইসলামী সাংবাদিকদের কল্যাণে কাজ করছে এবং করবে।
এসময় আরও বক্তব্য রাখেন- রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন তালুকদার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও ডিআরইউর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী), ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতি শফিক রেহমান, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, ডিইউজের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ডিআরইউর সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, রফিকুল ইসলাম আজাদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান।
এসময় উপস্থিত ছিলেন- ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি মেহ্দী আজাদ মাসুম, যুগ্ম সম্পাদক মো. জাফর ইকবাল, অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা, নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাহমুদ সোহেল, ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা, কার্যনির্বাহী সদস্য মো. আকতার হোসেন, আলী আজম, মাহফুজ সাদি, আল-আমিন আজাদ, মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন, সুমন চৌধুরী ও মো. আব্দুল আলীম।
বিএইচ