
ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের করা শতাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)–চুক্তি সরকার পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এই পর্যালোচনার ফলাফল শিগগির আসবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন–পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ এ কথা বলেন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সরকারদলীয় অন্যান্য হুইপ উপস্থিত ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার এই সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার চুক্তির আওতায় বন্ধুরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল এবং ওই চুক্তি বাতিলের বিষয়ে জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে নূরুল ইসলাম বলেন, আমরা চুক্তিগুলো, মানে সব—১০১টা এমওইউ নিয়ে আলোচনা করছি এবং সেটার ফল অনতিবিলম্বে আপনারা পাবেন।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ৯ কার্যদিবসের ছিল বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এই অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন বিধিতে ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদের অধিবেশন বসার ধারাবাহিকতায় এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় বলে উল্লেখ করেন নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগামী অধিবেশনও একই ধারায় হবে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা, পরে সমালোচনার মুখে তা বাদ দিয়ে সংসদে বিল পাস করা নিয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না। সরকার বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। এ জন্যই চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটা বাতিল করা হয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রসঙ্গ
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোয় বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ও সভাপতির পদ নিয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে নূরুল ইসলাম বলেন, অতীতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুব বেশি নেই। তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাখা হয়েছে। সরকারের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কমিটি সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর একটি। সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এ কমিটির কাছে জবাব দিতে হয়।
চিফ হুইপ বলেন, মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে হিসাব করলে এই সংখ্যা কিছুটা বেশি। ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের ৩ জন করে সদস্য দেওয়া হয়েছে। অন্যগুলোয় দেওয়া হয়েছে দুজন করে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী গুরুত্বপূর্ণ
তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া ছয়টি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মা–বাবা তাঁদের জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন। এর লক্ষ্য বৃদ্ধ মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর মা–বাবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন বা তাঁদের ভরণপোষণ হয় না। নতুন আইনে তাঁদের জীবদ্দশায় সম্পত্তির ওপর ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, বিলগুলো তৈরির আগে বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়। ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদেরও পরামর্শ নেওয়া হয়। অধ্যাদেশে শাস্তির ক্ষেত্রে যে সীমা ছিল, পাস হওয়া বিলে তা আরও কঠোর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি, তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যথাযথ মর্যাদার বিষয়টিও খেয়াল রাখা হবে।
২০৫ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিগত সরকারের (হাসিনা সরকার) রেখে যাওয়া ঋণের বিপরীতে ২০৫ কোটি ডলার গত পাঁচ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে। এই অর্থ জনগণের করের টাকা। তাই সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি অর্থের একটি টাকাও অপচয় না করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ–গ্যাসের সমস্যা নিয়ে সরকারের সমালোচনা প্রসঙ্গে কথা বলেন নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। তাই চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ খাতে হাসিনা সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও দায়মুক্তির সমালোচনা করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। সেই সরকারের করা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন তিনি।
জুলাই সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন হবে
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার বলে মন্তব্য করেন নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন পর্যন্ত পরিষ্কার। সরকার পুরোটা বাস্তবায়ন করবে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এ সনদ সই হয়। এটি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই সরকার জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে।
চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। বিরোধীপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধন করা হলে তা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু সংস্কার করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন সময়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। ভারতেও সংবিধান বহুবার সংশোধন করা হয়েছে।
এএ