
বোন ফারিহা,
দু'টা কথা বলতে চাই।
আপনার ভিডিওটি দেখলাম। আপনি ঘোর বিপদে আছেন সন্দেহ নেই। আপনার এই বিপদে কিছুই করতে পারছি না বলে নিজের কাছে খারাপ লাগছে। আপনার সর্বশেষ পোস্ট থেকে জানলাম আপনি আপাতত ভালো আছেন। আপনার পিতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অপরাধী আইনের আওতায় আসবে এটাই স্বাভাবিক। এই কাজটাই আপনি সরাসরি করতে পারতেন, তাতে ভিডিও আপলোড করার দরকার ছিলো না। এতে দু'টা লাভ হতো। প্রথমটি হলো, আপনার আগে আপনার পিতা জিডি করার সুযোগ পেতো না। দ্বিতীয়টি হলো, এই ভিডিও দেখার পর অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতো না (পালিয়ে যায়নি, তবে যেতেও পারে)।
আপনার ভিডিওর বক্তব্য এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বলতে চাই।
ভিডিওর এক স্থানে আপনি বলেছেন ২০১২ সালে আপনাকে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেতে দেয়া হয়নি এবং আপনাকে মারা হয়েছে। কথা হলো, সেই সময়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার মতো পরিপক্কতা আপনার ছিলো কিনা।
বাবার প্রহারে আপনি প্রতিবাদী হয়ে বাবার পেটে লাথি মেরেছেন সেটা আপনার মুখেই শুনলাম। যে কন্যা এতোখানি প্রতিবাদী হতে পারে, সে অবশ্যই ঘরের পাশের পুলিশ স্টেশনেও যেতে পারে। সেটা আপনি করলেন না। এমনকি কোনো নিকটাত্মীয় বা পারিবারিক গুরুজনের কাছে বিচার না দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন। কোনো একজনের বাসায় গিয়ে, গুছিয়ে একটি স্ক্রিপ্ট লিখলেন (ভিডিওর একাধিক স্থানে স্ক্রিপ্ট দেখে পাঠ করেছেন সেটা স্পষ্ট)।
আপনার আপন ছোটভাই এবং খালা আপনার অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন। খালা নাহয় অভিভাবকদের পক্ষ নিবেন। কিন্তু ছোটভাইয়ের (আহমদে ইরাম) অবশ্যই বোনের পক্ষেই থাকার কথা। সেটা না করে সে আপনার অভিযোগকে অস্বীকার করেছে এবং এর পক্ষে প্রমাণও দেখিয়েছে।, আপনি আপনার পরিবারের সাথে বহুবার আনন্দের সময় কাটিয়েছেন এবং আপনার পিতাকে মিস করেছেন অনেকবার অনেকস্থানে, এমন ছবি দেখলাম। এটি আপনার কথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আপনার পোস্টগুলোতে শত শত মানুষের মতামত দেখলেই বোঝা যায়, অনেকেই আপনার বক্তব্যগুলোকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সেই মতামতদানকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
আমি মোটেও বলতে চাই না যে, আপনার অভিযোগ মিথ্যা। আমি আপনার অভিযোগগুলো শুনেছি এবং অপরাধীর শাস্তি দাবী করছি। অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থাৎ আপনার পিতার প্রতি তার কৃতকর্মের জন্য জঘন্যতম ঘৃণাও প্রকাশ করছি। ঘৃণাটা আরো পোক্ত হতো যদি আমরা অভিযোগকারীর ছবি না দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবিটি দেখতে পেতাম। অতীতে অভিযুক্ত ব্যক্তিই সমাজের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে বারবার, অভিযোগকারী নয়।
বোন, আপনার আশেপাশে থেকে আপনাকে যারা সাহায্য করছে, তাদের পরিপক্কতার অভাব আছে। তারা সাপোর্ট দিতে চাইলে আইনি সাপোর্ট দিতো, ভিডিও তৈরির মতো বুদ্ধি দিতো না।
সৎ পিতার কাছে নির্যাতিত হয়ে কিছুদিন আগে এক বোন অভিযোগ করলেন, সেই সৎ পিতা গ্রেফতার হলো। রেইনট্রি হোটেলে নির্যাতনের শিকার দুই তরুণীর অভিযোগের ফলে অপরাধীকে আটক করা হলো। এমন নজির ভুরি ভুরি আছে। আপনিও ঠিক এটিই করতে পারতেন। না করার ফলে কয়েকটা ক্ষতি হয়ে গেলো।
ক্ষতিগুলো হলো,
এই 'ভাইরাল' প্রজন্ম আপনার কাছ থেকে শিখলো, মা-বাবা পিটালে ভিডিও বানিয়ে ছেড়ে দিতে হয়। ঠিক কোন পর্যায়ের নির্যাতন হলে সেটাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনা যায়, সেটা নির্ধারণ করার জ্ঞান এই জেনারেশনের অনেকেরই এখনো হয়নি। তারা শুধু ভাইরাল করতে জানে। ভিডিও ছাড়লেই সেটা ভাইরাল হয়। লাখ লাখ কোটি কোটি ভিউ হয়। আধাবেলা আলোচনা হয় সারাদেশে। সামাজিক মাধ্যম তাই 'সা-ম্যাজিক' মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যে সমাজে কিছুই ভাববার নেই, কিছুই করবার নেই, সমস্তই ধরাবাধা, সে সমাজ কি বুদ্ধিমান শক্তিমান মানুষের বাসযোগ্য? অর্থাৎ এই ধরাবাধা প্রজন্মের কাছে এই ভিডিও নির্মাণের আইডিয়াটা খুবই ছড়িয়ে যাবে এবং মা-বাবারা অবশ্যম্ভাবী বিপদে পড়বেন।
পিতার প্রতি সন্তানের যে শ্রদ্ধাবোধ, সেটা ক্রমশ নষ্ট হওয়া শুরু করবে। পিতা স্নেহের অভিপ্রায়ে সন্তানের কাছে গেলেও, সেটাকে সন্তানেরা সন্দেহের নজরে দেখতে শিখবে।
এই প্রজন্ম শাসনকে 'ইনসিকিউরিটি' বলে জানবে। পশ্চিমা সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধ বলে কিছু নাই। সেখানে মা-বাবা যদি উচ্চস্বরেও কথা বলে তাহলে সন্তান পুলিশে কল দিয়ে বলে- 'আই এ্যাম ফিলিং ইনসিকিউরড'। পুলিশ এসে মা-বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের পারিবারিক টানের পরিমাপ এটাই। অনেক ক্ষেত্রে যদিও পরিবারই নেই তাদের। আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারগুলোতেও এই চর্চাটা ঢুকে যেতে পারে।
আইনি সহায়তা না নিয়ে, ভিডিও তৈরির এই চর্চা বন্ধ হোক। নয়তো, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে একটা গোটা প্রজন্ম ভুল পথে হাঁটা শিখতে পারে। এটাই আমার বক্তব্য।
সকল নির্যাতনকারী শাস্তি সর্বোচ্চ পাক। নির্যাতনকারীর পরিচয় যেটাই হোক।