
>> কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যারা তদন্ত করেছে তারা চিটার, তাদের জরিমানা হওয়া উচিত: দেলোয়ার হোসেন
>> তিনি নির্দোষ হলে সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে: মুখপাত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক
>> তার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে: ওবায়দুল হক, এমডি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক
একের পর এক অনিয়ম ও জালিয়াতিতে জড়াচ্ছেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) মো. দেলোয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনি কমার্স ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।
এনআরবিসি ব্যাংকের ২৩২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। এরপর এই তথ্য গোপন করে আবার চাকরি নেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে। এখানে আসার পরও তার বিরুদ্ধে দুইবার অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। কমার্স ব্যাংকে তার নিয়োগকে অবৈধ উল্লেখ করে তাকে বরখাস্ত করার নির্দেশও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মো. দেলোয়ার হোসেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় বিতরণ করা ঋণে গুরুতর অনিয়ম এবং আমদানি-রপ্তানিতে নন-ফান্ডেড ঋণে গ্রাহককে অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন। এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার ওপর ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল ভিত্তিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম পাওয়া যায়। ওই শাখার গ্রাহক মেসার্স বেক নিট ২০১৯ সালের এপ্রিলে ৮ হাজার ৪১৯ ডলারের পণ্য জাহাজীকরণ করে। চার মাস পার হলেও রপ্তানির অর্থ দেশে আনেনি গ্রাহক। এ বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্ট করার কথা থাকলেও তা করেনি ব্যাংক। বরং মেয়াদোত্তীর্ণ রপ্তানি বিলের তথ্য গোপন করে গ্রাহককে ৫৭টি কেসের বিপরীতে ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকার নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। একইভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ বিলের তথ্য গোপন করে আরও দুটি গার্মেন্টসকে প্রায় ২ কোটি টাকার নগদ সহায়তা দেয় এই শাখা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুদক দেলোয়ারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১১ জুলাই মামলা করে। মামলায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং যুক্তরাজ্যে ৭ লাখ ৩ হাজার ৯৫ ডলার মূল্যের সোয়েটার রপ্তানির মূল্য না এনে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি এখনও চলমান।
এনআরসিবিসি ব্যাংকের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মো. দেলোয়ার হোসেন এনআরবিসি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। শাখা ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় অন্তত ২৩২ কোটি টাকার জালিয়াতিতে তাঁর সম্পৃক্ততা পায় এনআরবিসি ব্যাংক। এসব কারণে ২০২২ সালে তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করে নিরীক্ষা দল। এসব উদ্যোগের মধ্যে তিনি ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। এর ১২ দিন পর ১৮ ডিসেম্বর ব্যাংক তাঁকে জানিয়ে দেয়, শাখার বিভিন্ন জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, কোনো ছাড়পত্র না নিয়ে ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে কমার্স ব্যাংকে দেলোয়ার হোসেন যোগ দেন। সেখানে উল্লেখ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে এনআরবিসি ব্যাংকে কোনো প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন নেই। বাংলাদেশের কোনো আদালতে কোনো মামলা বিচারাধীন নেই। যোগদানের ছয় মাসের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে অব্যাহতিপত্র এনে জমা দেবেন। তবে তিনি তা জমা দেননি।
তারপর কমার্স ব্যাংকে যোগ দিয়েও তিনি জড়িয়ে পড়েন অনিয়মে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৩ সাল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত দেলোয়ারের আবেদনে কমার্স ব্যাংক থেকে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন দেখানো হয়। সাসপেন্স হিসাবের স্থিতি থেকে উত্তোলন-পরবর্তী বিভিন্ন খরচ খাত ডেবিট করে সমন্বয় দেখানো হয়। ভাউচার নিরীক্ষা না করে এবং আর্থিক ক্ষমতা অমান্য করে এ খরচ করা হয়েছে। ব্যাংকিং নিয়ম-নীতির যা সুস্পষ্ট লঙ্ঘন
উদাহরণ হিসেবে খরচের কয়েকটি নমুনা খাত উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন– ইন্টারেস্ট অব এজেন্ট কমিশন হিসেবে ৩২ লাখ ৫০ হাজার এবং অন্যান্য খাতে ১২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সাসপেন্স খাত থেকে নেওয়া ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার কোনো ভাউচারই দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর সান্ড্রি খাত থেকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ৭ নভেম্বর ১৮ লাখ ১১ হাজার টাকা উত্তোলন করেন তিনি। একদিন পর ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার মাধ্যমে যা সমন্বয় করা হয়। এসব লেনদেনের বিপরীতে যৌক্তিক কোনো জবাব দিতে পারেনি শাখা। এসব লেনদেন সন্দেহজনক এবং মানি লন্ডারিং হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
তারপর, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক থেকে প্রণোদনার নামে ১৩ কর্মকর্তা যে ৪ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে সেখানেও রয়েছে মো. দেলোয়ার হোসেনের নাম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর নামে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ১৪টি চেকে তারা এই টাকা তুলেছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ৪ জুন ৯টি চেকে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ৭ জুন ৫টি চেকে ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখায় আনা আরও ৫ কোটি টাকা নিয়েছেন তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ৫ কোটি টাকা তিনটি পাটের বস্তায় শাখায় এনে পরে ছয় বস্তায় প্যাকেট করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়-দুই কর্মকর্তা টাকা নিয়ে শাখা ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় ২৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নতুন আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত। পরে তা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বাড়তি সময়ের ব্যাপারে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল না। কিন্তু তা আমলে নেয়নি ব্যাংক। পরে ১৩ কর্মকর্তাকে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের বিপরীতে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৪ টাকা হারে প্রণোদনা। যে সব কর্মকর্তা এই সুবিধা নিয়েছেন এর মধ্যে রয়েছেন-এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ৮০ লাখ টাকা, এফএভিপি মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ ৮০ লাখ টাকা, এভিপি সালেহ আহমেদ ২০ লাখ টাকা, অফিসার মো. সরোয়ার ৮ লাখ টাকা, এফএভিপি সুজন দাস ৮ লাখ টাকা। এভিপি তাশনুভা মজুমদার, মো. আহসান হাবীব ও পিও মো. আদনান শফিক-প্রত্যেকে ৪০ লাখ টাকা করে পান। আরও রয়েছেন-মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল হক, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর রহমান ও শাহিনুর রহমান।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সব কিছু উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে। এনআরবিসির অনিয়মের তথ্য গোপন করে কমার্স ব্যাংকে চাকরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি হাইকোর্টের অর্ডার নিয়ে কাজ করতেছি। কোনো তথ্য গোপন করি নাই। আর টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ এনেছে এটা মিথ্যা।
প্রণোদনার নামে কমার্স ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের সাথে তার নাম রয়েছে-এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এমডি স্যারের নির্দেশে গাড়িতে করে গিয়েছিলাম। এর বেশি আমি কিছু জানি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের যারা তদন্ত করেছে তাদের জরিমানা হওয়া উচিত। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তদন্ত করেছে।
মো. দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরি হোসেন খান বলেন, তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম এসেছে। তিনি যদি নির্দোষ হন তাহলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানাতে হবে যে অমুক কর্মকর্তা নির্দোষ।
এসব বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক বলেন, বিষয়টির আসলে ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আসল ঘটনা এটা নয়। আপনি কাগজ দেখলেই বুঝতে পারবেন। দেলোয়ার হোসেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার তদন্ত হচ্ছে।
সূত্র: অনিয়ম করে এনআরবিসি থেকে বরখাস্ত, কমার্স ব্যাংকে এসেও জালিয়াতিতে দেলোয়ার