চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৬৬ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২১ জন। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে নারী ও শিশু ১৭ জন এবং পুরুষ চারজন। তবে আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষের হার বেশি। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৯৩ জন পুরুষ, ১ হাজার ২৭৮ জন নারী এবং ৯৯৫ জন শিশু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত দেশে জুন-জুলাই থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে তা কমে আসে। তবে এ বছর জুন-জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও আগস্ট থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। সেপ্টেম্বর মাসে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অক্টোবরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। একই সাথে রয়েছে ভ্যাপসা গরম। এমন আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। এর পাশাপাশি ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ার, ফুলের টবসহ বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীর বাইরে সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। মহানগরের বাইরে জেলায় আক্রান্ত ১ হাজার ৯২০ জনের মধ্যে সীতাকুণ্ডেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬২ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৬৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া রাঙ্গুনিয়ায় ১৪৫, বাঁশখালীতে ১৪২, সাতকানিয়ায় ১০৯, আনোয়ারায় ১০৭, রাউজানে ৯৩, পটিয়ায় ৮৮, হাটহাজারীতে ৭৬, মিরসরাইয়ে ৭৪, বোয়ালখালীতে ৭১, চন্দনাইশে ৬৫, লোহাগাড়ায় ৬১, ফটিকছড়িতে ৩৭ এবং সন্দ্বীপে ২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
সর্বশেষ পাওয়া হাসপাতালভিত্তিক তথ্যে, চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১ জন, ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৩ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৩০ জন, চট্টগ্রাম সিএমএইচে পাঁচজন, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৬ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট। শুধু এনএস-১ পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে প্ল্যাটিলেট কমে যাওয়াকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তবে শুধু প্ল্যাটিলেট কমলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। জ্বর কমে যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যাটিলেট কমতে শুরু করে। এ সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্ল্যাটিলেট অত্যন্ত কমে গেলে বা রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিলে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। কোনো স্থানে যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মশক নিধনে নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে।
গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম হলেও সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে মোট ৪ হাজার ৮৬৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং ২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন, মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১০৭ জনের। ২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মারা যান ৪১ জন।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি।
এনজে