শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পর ভয়াবহ ধস নেমেছে। প্রায় ৫০ মিটার এলাকাজুড়ে ফাটল দেখা দেওয়ার পর এর একটি বড় অংশ নদীগর্ভে ধসে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফাটল ধরা ৫০ মিটার অংশের মধ্যে প্রায় ৩০ মিটার ধসে পড়েছে। এ ঘটনায় নদীতীরবর্তী ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশে ফাটল দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে ফাটল বাড়তে থাকে। ১ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে ফাটল ধরা অংশে ধস শুরু হয়। পরদিন বিভিন্ন প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরিমাণ ২০ থেকে ৫০ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। তবে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেনের উদ্ধৃত তথ্যে ৫০ মিটার ফাটল ধরা অংশের মধ্যে প্রায় ৩০ মিটার ধসে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
বাঁধের ধসের পর সুরেশ্বর মাছঘাট ও বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর ভাঙন থেকে নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মালামাল রক্ষায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট ও আড়তের মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় অন্তত ১৪ টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সুরেশ্বর মাছঘাটের ১৮ টি মাছের আড়ত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভাঙন অব্যাহত থাকলে সুরেশ্বর মাছের আড়ত, মাছবাজার, লঞ্চঘাট, আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।
বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার পর থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ধসের পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, ভাঙন ঠেকাতে আপৎকালীন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই কাজ চলছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন জানিয়েছেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় নদীতীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরে ফাটল ধরা অংশের একটি বড় অংশ নদীতে ধসে পড়ে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশের মাটি সরে গিয়ে ওই এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তারা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধসহ স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে এই অভিযোগকে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তে চূড়ান্তভাবে ভাঙনের কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পদ্মায় তীব্র স্রোত তৈরি হয়েছে এবং সেই স্রোতে বাঁধের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষার লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ডান তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা এবং তীররক্ষা কাজের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ প্রকল্পের আওতায় সুরেশ্বর লঞ্চঘাট থেকে জাজিরার দিকে পদ্মার ডান তীর রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আগে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নড়িয়া ও জাজিরার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙনে বহু পরিবার ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিদর্শনের পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রক্ষায় জরুরি জিও ব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজ কয়েক দিন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সুরেশ্বরের ব্যবসায়ী ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা বলছেন, তারা অতীতের ভয়াবহ নদীভাঙনের অভিজ্ঞতা আবারও ফিরে আসুক তা চান না। দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে বাঁধের অবশিষ্ট অংশ রক্ষা এবং বাজার, লঞ্চঘাট ও বসতবাড়ি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় তীররক্ষা বাঁধে নতুন করে ধস নামায় পদ্মার তীব্র ভাঙন আবারও আলোচনায় এসেছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত অংশের স্থায়ী সমাধান এবং বাঁধের অবশিষ্ট অংশের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেললেই হবে না, বাঁধের কারিগরি অবস্থা, নদীর স্রোতের গতিপথ, তলদেশের পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য বালু উত্তোলনসহ সামগ্রিক বিষয় পরীক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে সুরেশ্বর বাজার, মাছঘাট, লঞ্চঘাট ও আশপাশের জনবসতি ভবিষ্যৎ ভাঙনের ঝুঁকি থেকে কতটা নিরাপদ রাখা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এনজে