
রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারি যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য নদী খননের উদ্যোগ নিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। এজন্য ‘মংলা হতে চাঁদপুর-মাওয়া-গোয়ালন্দ হয়ে পাকশী পর্যন্ত নৌ-রুটের নাব্য উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারি মালামাল পরিবহন নিরাপদ ও সহজতর হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে প্রক্রিয়াকরণ শেষে আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত ২২ মে প্রকল্পটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে একনেকে অনুমোদনের যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে পরিকল্পনা কমিশন।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে যাতায়াত ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নদীগুলোতে প্রতিবছর বন্যায় ৫ মিলিয়ন কিউসেক পানি এবং ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি বাহিত হয়, যা সারা বিশ্বের পরিবাহিত পলির ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে নদীগুলো ক্রমান্বয়ে নাব্য হারাচ্ছে। তাই নৌ-পথ সচল রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ড্রেজিং করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মালামাল পরিবহনের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌ-পথ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পাকশীর কাছে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারি মালামাল সমুদ্র বন্দর থেকে পরিবহনের জন্য নৌ-পথ ব্যবহার করা হবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটির চতুর্থ সভায় চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর হতে রূপপুর পর্যন্ত নৌ-পথের প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ৯৭০ কোটি টাকার ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। গত ২২ মে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর অনুষ্ঠিত পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চৌদ্দ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়। ফলে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৫৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ৪৪২ জনমাস পরামর্শক সেবা, ৮৭০ কিলোমিটার হাইড্রোলিক সার্ভে পরিচালনা, ৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ, দুই কোটি বর্গমিটার প্রকৌশল জরিপ, ১৪ লাখ ঘনমিটার মাটির ডাইক নির্মাণ, ৯৩ দশমিক ১০ লাখ ঘনমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং, ২৫৬ দশমিক ৯০ লাখ ঘনমিটার মেইনটেনেন্স ড্রেজিং, চার লাখ বর্গমিটার তড়জার বেড়া নির্মাণ, ৬৫০টি নেভিগেশন সহায়ক সরঞ্জামাদিসহ অফিস সরঞ্জাম, ফার্নিচার, কম্পিউটার এবং যানবাহন কেনা হবে।
যেসব জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে সেগুলো হচ্ছে, ঢাকা বিভাগের মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং ঢাকা জেলা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল এবং পিরোজপুর জেলা। রাজশাহী বিভাগের পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
সূত্র জানায়, দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প হিসেবে রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে পাবনার রূপপুরে। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। মোট ব্যয়ের মধ্যে ঋণ হিসেবে রাশিয়া দিচ্ছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভিভিইআর-১২০০ (এইএস-২০০৬) রিঅ্যাক্টরের দুটি বিদ্যুৎ ইউনিটের (ইউনিট-১ ও ২) সমন্বয়ে ২৪শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার পরমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হবে। সেই সঙ্গে এটি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভৌত অবকাঠামো তৈরি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং কার্বনমুক্ত ও বেইসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা সম্ভব হবে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৪০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত মে মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২০৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।