
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য ও প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্রস্তাব পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতারণা মোকাবিলায় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং পুঁজিবাজারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) যৌথভাবে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক ও হোসেন সাদাত এবং ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।
মমিনুল ইসলাম বলেন, ইস্যুয়ার, ইস্যু ব্যবস্থাপক ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএসইসি কিংবা বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ কেউ নিজেদের নিবন্ধিত বা লাইসেন্সধারী আর্থিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব বিনিয়োগ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, যেখানে অল্প সময়ে বিপুল মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে তা দুই লাখ টাকা হয়ে যাবে। মানুষের দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা এ ধরনের ফাঁদ তৈরি করছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে আগেও বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণা ছিল। তবে ডিজিটাল অবকাঠামো, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এসব প্রতারণা এখন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রতি তাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এসব ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের কারিগরি বিশ্লেষণ প্রকাশ করছেন, যার কিছু ক্ষেত্রে বাজারের মৌলভিত্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না। আবার এসব বিশ্লেষণের পেছনে স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।
এ ধরনের অপতৎপরতা মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান বিধিবিধান এসব কর্মকাণ্ড অনুমোদন করে না। তাই অনিয়ম শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। ডিএসই পর্যায়ক্রমে তাদের নজরদারি ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আরও উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও সেগুলোর প্রত্যাশিত কার্যকারিতা সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। তাই আরও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে শুধু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, পুঁজিবাজারে বিকল্প ও ইতিবাচক বয়ান তৈরি করতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত বিনিয়োগ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। পুঁজিবাজারের আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ছোট এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে দেশব্যাপী পরিচিতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও সংকট দেখা দিলেও যেসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা এখনো অটুট। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পতনের প্রেক্ষাপটে এসব প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধির নতুন গতি পাচ্ছে। পুঁজিবাজারেও এ ধরনের শক্তিশালী ও আস্থাশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পুঁজিবাজারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তুলে ধরার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে গত ১৫ দিনের সংবাদগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে ইতিবাচক, নিরপেক্ষ ও নেতিবাচক—এই তিন ভাগে ভাগ করলে নেতিবাচক সংবাদের সংখ্যা ইতিবাচক সংবাদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যেতে পারে। ইতিবাচক তথ্য ও সংবাদ যথাযথভাবে তুলে ধরা না হলে নেতিবাচক সংবাদই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যমে বেশি ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন ভালো উদ্যোগ ও অগ্রগতির কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে ঘাটতি রয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচার ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক কম। এ সীমাবদ্ধতার সুযোগে বাজারকে প্রভাবিত করতে চাওয়া ব্যক্তিদের প্রচার মানুষের কাছে বেশি পৌঁছে যায়।
মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কার্যকর, সুস্থ ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকারের পুঁজিবাজারের প্রতি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে কোনো সরকারের কাছ থেকে পুঁজিবাজারের প্রতি এমন মালিকানাবোধ দেখেননি। বর্তমান কমিশনের দক্ষতা, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের প্রতিপাদ্য তুলে ধরে ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে থাকা ভীতি ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে ডিজিটাল প্রতারণা ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, আর্থিক মধ্যস্থতাকারী ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিএইচ