বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

প্রকাশ: ২০১৭-০৮-৩০ ১৫:২৫:১১


Sakibরোমাঞ্চ ছড়িয়েছে। ব্যাট-বলের লড়াইয়ের পরতে পরতে ছিল টানটান উত্তেজনা। প্রতিটি উইকেট যেমন হৃদস্পন্দন বাড়িয়েছে, ঠিক প্রতিটি রানে হৃদয়ে হয়েছে রক্তক্ষরণ। উত্থান-পতন, নাটকীয়তা এবং মুগ্ধতা ছড়িয়ে শেষ পর্যন্ত শেষ হাসিটা বাংলাদেশেরই। অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে রকেট বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই প্রথম টেস্ট জিতল টাইগাররা।

তাইজুল ইসলামের বল অফ স্টাম্পে পড়ে বাঁক খেয়ে জশ হ্যাজেলউডের প্যাডে আঘাত করে। মুশফিক, তাইজুল, সৌম্য, সাকিবের জোড়ালো আবেদন! যে আবেদনের সঙ্গে ছিল পুরো বাংলাদেশ! ১৭ কোটির চিৎকারে আঙুল তুলতে ভুল করেননি আম্পায়ার নাইজেল লং। মুহূর্তেই উত্তাল মিরপুর। প্রেসিডেন্ট বক্সে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে লাল-সবুজ পতাকা হাতে। বাঘের গর্জনে কুপোকাত ক্যাঙ্গারুর দল।

সাফল্যের রঙিন ক্যানভাসের চিত্রকর সাকিব আল হাসান। ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্ট রাঙিয়ে তোলার চেষ্টার কথা বলেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। দায়িত্বটা নিজের কাঁধেই তুলে নেন সাকিব। ম্যাচে ১০ উইকেট ও ৮৯ রান করে সাকিব আল হাসান ম্যাচসেরা। সাকিবের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন তামিম ইকবাল। ৫০তম টেস্ট খেলতে নেমে দুই ইনিংসে তামিমের রান ১৪৯।

ক্যানভাসে মিরাজ-তাইজুলও তুলির আঁচড় দিয়েছেন। মিরাজের ঝুলিতে ৫টি এবং তাইজুলের ঝুলিতে ৪ উইকেট। সব মিলিয়ে দলগত পারফরম্যান্সে অনন্য উচ্চতায় টিম বাংলাদেশ। তাইতো ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ বলতে ভুল করলেন না, ‘কোনো অজুহাত হতে পারে না এ পরাজয়ের। বাংলাদেশ অসাধারণ খেলেছে।’

টেস্ট ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের দশম জয়। এর আগে জিম্বাবুয়েকে পাঁচবার ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দুবার, শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডকে একবার করে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বলাবাহুল্য, ১৭ বছরের ছোট্ট টেস্ট ক্যারিয়ারে এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য। তবে ঘরের মাঠে গত বছর ইংল্যান্ডকে যেভাবে হারিয়েছিল, সেই জয়ের রেশ এখনো তরতাজা।

১৫৬ রান কিংবা ৮ উইকেট! ঢাকা টেস্টের চতুর্থ দিনে এমন পরিসংখ্যানে দাঁড়িয়ে ছিল দুই দল। প্রথম ঘণ্টায় ডেভিড ওয়ার্নার আর স্টিভেন স্মিথ ৬৫ রান তুলে ম্যাচ থেকে প্রায় ছিটকেই দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে! পরের ঘন্টায় বাঁক বদল। নিষ্প্রাণ মিরপুরে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন সাকিব। উপমহাদেশে প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদ পাওয়া ডেভিড ওয়ার্নারকে ফিরিয়ে সাকিব হৃদয়ে দোলা দেন।

১৩৫ বলে ১৬ চার ও ১ ছক্কায় ১১২ রান করে ওয়ার্নার যখন ফিরছিলেন, তখন স্মিথের কাঁধে রাজ্যের চাপ! কীভাবে খেলবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না নম্বর ওয়ান টেস্ট ব্যাটসম্যান। সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে লোভ দেখিয়ে সাকিব তুলে নেন স্মিথের উইকেট। অফ স্টাম্পের বাইরের বল কাট করতে গিয়ে মুশফিকের গ্লাভসবন্দী ৩৭ রান করা স্মিথ। ওয়ার্নার-স্মিথের ১৩০ রানের জুটির পর কোনো জুটিই ৩০ পেরোতে পারেনি। সর্বোচ্চ ২৯ রান আসে নাথান লায়ন ও প্যাট কামিন্সের নবম উইকেট জুটিতে।

স্মিথের বিদায়ের পর ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো পিটার হ্যান্ডসকম্বকে আউট করেন তাইজুল। সৌম্যকে ধন্যবাদ, দ্রুত যাওয়া ক্যাচটিকে দারুণ দক্ষতায় তালুবন্দি করার জন্য। বিরতির আগে ম্যাথু ওয়েড সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন সাকিবের বলে। প্রথম ইনিংসে অপরাজিত থাকা অ্যাশটন অ্যাগার এবার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। তাইজুলের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ২ রানে।

বিরতির আগে যেখানে রেখে গিয়েছিলেন, বিরতির পর সেখান থেকেই শুরু সাকিবের। প্রথম বলেই বোল্ড গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। সেই সঙ্গে সাকিবের পাঁচ উইকেট পূর্ণ। দ্বিতীয়বারের মতো ম্যাচে দশ উইকেট নেওয়ার কীর্তি সাকিবের।

শেষ দুই উইকেটের একটি তাইজুলের, একটি মিরাজের। নাথান লায়ন সুইপ করতে গিয়ে ক্যাচ তোলেন উইকেটের পেছনে। ঝাঁপ দিয়ে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় বল তালুবন্দি করেন সৌম্য। লায়ন ফিরে যাবার পর কামিন্স মিরাজের বলে দুই ছক্কা মেরে স্বাগতিক শিবিরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভয় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি তাইজুলের অসাধারণ ঘূর্ণিতে।

আগের দিন তামিম বলেছিলেন, এক-দুই উইকেট পড়লেই তাসের ঘরের মতো ভাঙবে অসি ব্যাটিং অর্ডার। তামিমের ক্রিকেটীয় জ্ঞান যে অসাধারণ, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। অস্ট্রেলিয়ার ২০ রানের আক্ষেপ বড় ব্যবধান হয়ে দাঁড়াল। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে মুশফিক-সাকিবরা ঈদ–উপহার দিল পুরো বাংলাদেশকে।

২০০৬ সালে ফতুল্লায় বাংলাদেশের হাতের মুঠো থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। এবার মিরপুরে মহাকাব্যিক জয়ে ১১ বছরের যন্ত্রণা একটু হলেও কমল বাংলাদেশের!