
কতো সম্ভাবনা যে অকাতরে ঝরে গেছে নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির বলি হয়ে শুধুমাত্র প্রিয়জনরা বা একান্ত আপনজনরাই সে হিসাব দিতে পারবেন। আমাদের রাষ্ট্র–রাজনীতি–সরকার–সমাজ সে হিসাব কি আদৌ রাখে? খ্যাত–অখ্যাত হাজারো জন গুম হয়ে যাবার পরে তাদের স্ত্রী–সন্তান, বাবা-মা’রা দিনের পর দিন, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকবেন, চোখের জল শুকিয়ে যাবে, ছানি পড়া চোখ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকবেন তার একান্ত জনের ফেরার অপেক্ষায়।কিন্তু ফেরা কি কারো হয়?রাজনৈতিক কিংবা ভয়াবহ কোন লোভের শিকার এসব মানুষেরা আর ফেরে না। পুলিশের হাতে অপহরনের পরে একজন জামালের মা কিংবা ত্বকী হত্যার পরে অথবা অসংখ্য খুনের পরে স্বান্তনা হিসেবে আপন জন খুনের বিচারের জন্য অপেক্ষার কাল কাটাবেন যুগের পর যুগ। কিন্তু ন্যায় বিচার কি কখনো তারা পাবেন? এই রাষ্ট্র–সরকার ন্যায় বিচার কি নিশ্চিত করতে পেরেছে? যারা গণতন্ত্রের ধ্বজা ধরে আছেন, তাদের বোধকরি বিবেচনার সময় এসেছে, আর কতকাল ধারাবাহিকভাবে সাধারণ মানুষকে বর্বরতার শিকার হয়ে পরিবার–পরিজনশুদ্ধ চরম মাশুল গুনতে হবে?
খুনী কারা, রাষ্ট্র–সরকার সকলেই খুনিদের পরিচয় জানে। তারা সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলে, পত্র–পত্রিকায় সাক্ষাতকার দেয়, রাষ্ট্র সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে– থেকে যায় ধরা–ছোঁয়ার বাইরে। যদি বা কখনো তারা বিচারের মুখোমুখি হয়, শাস্তি হয় তাদের তাহলে রাজনৈতিক বিবেচনায় একসময় রাষ্ট্রপতি তার দণ্ড মওকুফ করে দেন অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। সব ঘটনার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিসহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্য সবসময়ই আমার সাজানো রেকর্ডের মতো মনে হয়।মনে হয়, ঘটনা যতই ভয়াবহ হোক না কেন, তারা ৪৮ ঘন্টা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে অপরাধীদের ধরে বিচারের ব্যবস্থা করার কথা বলে থাকেন।মানবাধিকার কমিশন বলে দিয়েছেন, সুপারিশ ছাড়া কিছু করার ক্ষমতা তার নেই। তাদের ভাষায়, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও খুনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা ছাড়া কমিশনের আর কোন ক্ষমতা নেই।
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের ওয়াদা করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর এটা এখন সুষ্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার ওয়াদা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার বদলে তাদের নিজেদের অতীত এবং পূর্ববর্তী সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা তো করছেই, বরং তাদের আমলে নতুন সংযোজিত হয়েছে ‘গুম’ এর মতো ভয়ংকর ঘটনা। এরকম গুমের ঘটনায় গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে ১৪৫ জন মানুষ। তাদের আত্মীয়–স্বজন, একান্ত জনেরা এখনো জানেন না এইসব মানুষেরা আর ফিরে আসবে কিনা? যদি তারা ফিরে না আসেন, তাদের পরিনতির কথা অন্তত: প্রিয়জনরা জানতে চান। সহিংসতা, খুন, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডেরঘটনায় আতঙ্কিত এই জনপদ। সাধারণ মানুষ জানতে চায় - এই সকল কাজের শেষ কোথায়?