
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন অন্তর্ভুক্ত করে প্রত্যাহার করা হচ্ছে আয়কর রেয়াত সুবিধা। এর ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ থেকে ১৫ শতাংশ আয়কর কেটে নেয়া হবে। এ কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের নিট মুনাফা কমবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের ‘নগদ ও ঋণ’ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সুবিধাটি পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের ডাটাবেজে টিআইএন অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়, যা বাস্তবায়ন করবে জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর।
এ খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে টিআইএন শর্ত কার্যকর হলে বিনিয়োগে ভাটা পড়তে পারে। বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা এর চেয়ে ঝুঁকিমুক্ত বেশি মুনাফার পথ তালাশ করবে। তাদের মতে, টিআইএন শর্ত আরোপ হলে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তবে যারা সাধারণত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন তাদের শিগগির ব্যাংকমুখী করা সম্ভব হবে না।
উল্লেখ্য, বর্তমানে একজন ব্যক্তি আয়ের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারেন সঞ্চয়পত্রে। মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে একজন বিনিয়োগকারী মোট ৫ হাজার টাকা মুনাফা পেলে সেখান থেকে ১৫ শতাংশ আয়কর কেটে রাখা হবে।
জানা গেছে, অর্থ সচিব (সদ্য বিদায়ী) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সরকারের ‘নগদ ও ঋণ’ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক আবুল ফজলে মো. আবিদ, জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের ডিজি সামছুন্নাহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জালাল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (করনীতি) কানন কুমার রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার অধিক হারে টাকা নেয়ায় দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করা হয়। এ ছাড়া প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি এবং সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদের কারণে সরকারি ঋণের ঝুঁকিও বাড়ছে। বৈঠকে এ মতামতও উঠে আসে।
বৈঠকে উপস্থাপিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ ৫ বছর। কিন্তু ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ ২-২০ বছর। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত স্বল্পমেয়াদি (সঞ্চয়পত্র) অধিক মাত্রায় ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে।
ফলে সরকারের ঋণ পোর্টফোলিওতে ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়ছে। সম্প্রতি পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করেছে যে, কম সুদ ব্যয়সম্পন্ন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে না। বরং বেশি পরিমাণে সুদ পরিশোধ করে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতিও ব্যাহত হচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে।
অপরদিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থ সঞ্চয়পত্র খাত থেকে আসায় সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে কম ঋণ নিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো বকেয়া ঋণের ১০ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ওই বৈঠকে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ঝুঁকি এবং ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে আয়কর রেয়াত সুবিধা পর্যালোচনা করতে বলা হয় এনবিআরকে। পাশাপাশি এটি পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কমবে।
প্রসঙ্গত, সঞ্চয়পত্রের ওপর প্রস্তুতকৃত সরকারের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়ার হার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়। একই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার হার ৬৬ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে নেমেছে।
পর্যালোচনা প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়ার হার বেড়েছে ২২ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকেও ২২ শতাংশ ঋণ নেয়ার হার কমেছে।
এদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ গ্রহণের কারণে এ খাতে সুদ পরিশোধের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ৪০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
একই সময়ে সরকার এ ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করেছে ১৬ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নেয় ১২ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা।