বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবহারে অবস্থান হারাবে কয়লা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০১৮-১১-১৪ ১৫:৪৫:৩৩


বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি দ্রুত বদলাচ্ছে। বাড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি। শিল্পোন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি চীন, ভারতের মতো অর্থনীতির দ্রুত উত্থান ঘটছে। পিছিয়ে নেই মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, এমনকি বাংলাদেশও। অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক ব্যবহারে চাঙ্গাভাব বজায় রয়েছে। তবে বদলাতে শুরু করেছে জ্বালানি ব্যবহারের ধরন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে দেশে দেশে সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী কয়লার পরিবর্তে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ও সস্তা জ্বালানি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবহারে দ্বিতীয় শীর্ষ পণ্য হিসেবে কয়লা অবস্থান হারাতে পারে। এ সময় কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসের

ব্যবহার বেশি হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। খবর রয়টার্স ও সিএনবিসি।

প্যারিসভিত্তিক আইইএর ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪০ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যের সম্মিলিত বৈশ্বিক ব্যবহার বর্তমানের তুলনায় এক-চতুর্থাংশের বেশি বাড়তে পারে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক ব্যবহার বর্তমানের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রতি বছর প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক ব্যবহারে ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কয়লা ব্যবহারে উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার হওয়া জ্বালানি পণ্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে জ্বালানি তেল। এর পরই যথাক্রমে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অবস্থান। তবে কয়লার বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাস দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ২০৩০ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক ব্যবহারে কয়লাকে টপকে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে চলে আসতে পারে বলে মনে করছে আইইএ। এ সময় সবচেয়ে ব্যবহার্য জ্বালানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে থাকতে পারে জ্বালানি তেল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পশ্চিমা দেশের পাশাপাশি প্রাচ্যের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে এসব দেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারে ঝুঁকছে। বিপরীতে বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার দ্রুত কমে আসছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে আইইএ। প্রথমত. দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর অধিকাংশ আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করে। এ কারণে স্বল্প মূল্যের জ্বালানি পণ্য ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমদানি ব্যয় সীমিত রাখতে আগ্রহী এসব দেশ। ফলে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ও পরিবহন ব্যয় কম লাগায় দেশগুলো কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসের (বিশেষত এলএনজি) ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

দ্বিতীয়ত. আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আগামী বছর নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তেলনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত. জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে দেশে দেশে সচেতনতা বেড়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত রাখার ব্যাপারে দেশগুলো নীতি প্রণয়ন করেছে। এ কারণে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত পশ্চিমা দেশগুলো কয়লা ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশ জ্বালানি পণ্যটির ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এসব দেশেও প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজির ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে।

তবে ভারত, চীনসহ প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলো কয়লার ব্যবহার কমানোর বিষয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তবে বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হিসেবে চীন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় চীনের অবস্থান বিশ্বে প্রথম। দেশটিতে ইস্পাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল ও কয়লা ব্যবহার হয়। চীনেও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছর শেষে জাপানকে টপকে প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ আমদানিকারক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে চীন।