কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেডকে চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রদান করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ। আজ বৃহষ্পতিবার ৭ ফেব্রুয়ারী প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সরকারের ভারপ্রাপ্ত সচিব জনাব মোঃ ফারুক হোসেন,বিআইডাব্লুটিএ এর চেয়ারম্যান কমোডপ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, লে:জেনারেল মো: আনোয়ার হোসেন (অব:), চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট জনাব মোঃ মাহবুবুল আলম এবং কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকনোমিক জোন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশীদ।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত এই ড্রাই ডকটি হবে প্রায় ১ লক্ষ DWT ক্ষমতা সম্পন্ন। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে শিপবিল্ডিং এবং জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দেশের সর্ব প্রথম বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল ।
প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত স্থানে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি সড়ক, বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের কাজ শেষ করেছে। এখন সেখানে ড্রাই ডকের জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। এই অঞ্চলটিতে ১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক হতে প্রাপ্ত ঋণ অন্তর্ভুক্ত আছে। আগামী মার্চ, ২০১৯ এর মধ্যে জেটি নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে। প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৩০০০ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এ অঞ্চলটিতে।
চট্টগ্রামে বর্তমানে একটি মাত্র সরকারী ড্রাই ডক রয়েছে, যা বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীকর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। সত্তর দশকের পর থেকে কন্টেইনার জাহাজ এর প্রচলন শুরু হওয়ায় জাহাজগুলোর অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে প্রশস্থতা বৃদ্ধি পায়। ফলে পূর্বের জাহাজগুলির ধারন ক্ষমতা বা প্রশস্থতা বিবেচনায় রেখে বানানো ড্রাই ডকটিতে বর্তমান জাহাজগুলি ডক করা সম্ভবপর হচ্ছে না। এছাড়াও ডকটিতে ১৮,০০০ DWT ধারন ক্ষমতার বেশী জাহাজ নির্মাণ বা মেরামতের সুযোগ নেই এবং অন্যান্য সুবিধাও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে পায়রা বন্দর স্থাপন করায় ও ট্রানজিট ও ট্রান্সশীপমেন্ট চালু হওয়ায় চট্টগ্রামে বিদেশী জাহাজ আগমনের মাত্রা কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করলে জাহাজ আগমনের সংখ্যা আরো কয়েকগুন বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে বাংলাদেশ আর্ন্তজাতিক নৌ-সংস্থার সদস্য দেশ হিসেবে জাহাজের কাঠামোগত ত্রুটি পরিদর্শন ও পরবর্তীতে তা মেরামতের নিশ্চয়তা বিধান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে যা ড্রাই ডক ছাড়া ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব হয় না।
উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি বছর প্রায় ২,৫০০টি জাহাজ আগমন করে। এছাড়া বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বাংলাদেশ পতাকাবাহী ৩০টি জাহাজ আছে। অন্যদিকে বিদেশী রেজিস্ট্রেশনে বাংলাদেশী মালিকানাধীন আরো অনেক জাহাজ রয়েছে। এসকল জাহাজ প্রতি ২/৩ বছর অন্তর অন্তর ডকিং/মেরামত করার বিধিবদ্ধতা থাকলেও চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিঃ বড় জাহাজগুলির মেরামতে একদিকে যেমন অক্ষম অন্যদিকে ছোট জাহাজগুলির সিডিউল দিতে না পারায় জাহাজমালিকগন তাদের জাহাজগুলি
বিদেশে ডকিং/মেরামত করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত ড্রাই ডক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রগামী জাহাজ মেরামত এবং নির্মাণ শিল্পের বিকাশসহ বৈদেশিক বিনিয়োগের সুবিশাল ক্ষেত্র তৈরী হবে। আর্ন্তজাতিক নৌ-সংস্থার কনভেনশন সমূহ প্রতিপালন করা সহজ হবে এবং দেশের নৌ-নিরাপত্তা আরো সুসংহত করা সহ বন্দর পরিচালনায় সহায়ক হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকনোমিক জোন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশীদ বলেন - কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকনোমিক জোন লিমিটেডের আগামী বছর হতে বৃহৎ জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং এখান থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব হবে যা বাংলাদেশের রপ্তানীতে বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কমোডর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে বিনিয়োগকে আকর্ষনীয় এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বেজার পাশাপাশি বিডা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং বেপজার অধিনস্থ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার হতে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ তথা FDI আকর্ষণে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শুধুমাত্র সেবার মান বাড়িয়ে আমরা Ease of doing business এর সূচকের অবস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যাবে এবং FDI আকর্ষণে লক্ষমাত্রা অর্জন করা যাবে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সরকারের ভারপ্রাপ্ত সচিব জনাব মোঃ ফারুক হোসেন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে বেজার কর্মযজ্ঞের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে চায় তার প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, এজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরীতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ আলোকে কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, শিপবিল্ডিং খাতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অবদান রাখতে শুরু করেছে এবং এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কর্ণফুলী ড্রাই ডক হবে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল যার মাধ্যমে জাহাজ রক্ষনাবেক্ষণের একটি খাত উন্মোচিত হবে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়ে আরো সম্প্রসারিত হয়ে শিল্পের বিকাশ হবে। তিনি আরো বলেন, এর মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুবিশাল একটি ক্ষেত্র তৈরী হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সরকারী উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।