বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো দিনদিন বাংলাদেশেও ফুলের চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েই চলছে। ফলে ছোট্ট পরিসরে শখের বসে করা বাগানে আর এই ফুলের চাষ সীমাবদ্ধ থাকছে না। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশে এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতেও ফুলের উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে।
ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য এবং বিশুদ্ধতা সবাইকে আজ বিমোহিত করছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন দিবস গুলোতে বিশেষত মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ, ভ্যালেনটাইনস ডে, পহেলা ফাল্গ–নে ফুলের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, জাতীয় নেতাদের মৃত্যু বার্ষিকীতেও তাদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর প্রচলন বেড়েছে।
দেশব্যাপী সারা বছরই ফুলের কম-বেশি চাহিদা থাকে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে এ চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। পহেলা ফাল্গুন, বিশ্বভালোবাসা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই ফুলের ব্যাপক চাহিদা থাকে।
১৯৮৩ সালে দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে যশোরের ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রামে কৃষক শের আলীর মাধ্যমে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ জমিতে ফুলের চাষ শুরু হয়। সেই দৃশ্যপট বদলে এখন সারা দেশে ২৫টি জেলায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুলের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতীয় কৃষি বাতায়নের তথ্যমতে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ৫০ জাতের ফুলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ হেক্টর। এটা মোট ফুল আবাদি জমির ৭৪ ভাগ। ২য় স্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ ৬৯০ হেক্টর বা মোট আবাদের ২০ ভাগ।
এছাড়া ৩য় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ ১২১ হেক্টর বা ৩ দশমিক ৪৪ ভাগ। এছাড়া রংপুর বিভাগে ৪২ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়। যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক। এদের মধ্যে খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ২৫০ জন (৭৫ শতাংশ), ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার জন (২০ শতাংশ)। বাকি ৫ শতাংশ কৃষক রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে ফুল চাষে নিয়োজিত।
তাছাড়া প্রায় দুই লাখ মানুষ ফুল উৎপাদন ও বিপণন ব্যবসায় জড়িত। আর এ খাতের কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন আরও প্রায় ৭ লাখ মানুষ। উৎপাদিত ফুল দেশের চাহিদার বেশিরভাগ পূরণ করছে। কিছু ফুল বিদেশে রফতানিও হচ্ছে।
এখন দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার ৯০ শতাংশ মেটানো যাচ্ছে। বর্তমানে সার্বিকভাবে ফুলের বাজার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিছু ফুল আমদানি হলেও এখন দেশ থেকে ফুল রফতানিও হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গ্লাডিওলাস মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, দুবাই, কাতার ও আবুধাবিতে যায়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে ২০০৮ সালে ফুল রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৭৬ কোটি টাকা। বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ফুল রফতানি হয়। এর মধ্যে তাজা, শুকনো ও কৃত্রিম ফুল রয়েছে। দেশের বাজার ও রফতানির বাজার ধরে এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। একে কেন্দ্র করে গ্রামে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্যমতে, ফুল উৎপাদন ও বাণিজ্যিক চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত ১৪৫টি দেশ। বর্তমানে বিশ্বে বার্ষিক ফুলের চাহিদার পারিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে ফুলের বাজার প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।