সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন হয়। এ আন্দোলনের জের ধরে ৫ হাজার ৮৪৫ পোশাক শ্রমিককে আসামি করে ২৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও গাছা, সাভার, আশুলিয়া ও টঙ্গী পূর্ব থানায় ২৭টি কারখানার করা মামলায় ৪ হাজার ৩৪৫ শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫১৫ শ্রমিকের নাম উল্লেখ আছে, বাকিরা অজ্ঞাতনামা। সাভার থানায় শিল্প পুলিশের করা এক মামলায় আসামি ১ হাজার ৫০০ অজ্ঞাত শ্রমিক। আবার আন্দোলন করতে গিয়ে ছাঁটাই ও বরখাস্তের শিকার হয়েছেন অনেকে।
শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রচারণা শুরু করেছে ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইনসহ শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। সেটি অব্যাহত থাকলে পোশাক খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়বে।
মামলাগুলো হয়েছে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে । এসব মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, ৯৯টি কারখানার ১১ হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই ও বরখাস্ত হয়েছেন। অনেক নিরীহ শ্রমিকের পাশাপাশি ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের আন্তর্জাতিক জোট ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন (সিসিসি)লন্ডন, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, জেনেভা, বার্লিন, ব্রাসেলস, মাদ্রিদ ও দ্য হেগে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে ‘হ্যাশট্যাগ উই স্ট্যান্ড উইথ গার্মেন্ট ওয়ার্কার’ শীর্ষক কর্মসূচি পালন করে। সেখানে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও ছাঁটাইয়ে উদ্বেগ জানায় সিসিসি। ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও ছাঁটাইয়ের ঘটনায় আমরা মর্মাহত। শ্রমিকদের মধ্যে যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটি বন্ধ করা উচিত।’
এদিকে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, পোশাকশিল্পে এখনো শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, দুই বছর আগে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের ঘটনা অনেক বড়। তাই শিগগিরই মামলা প্রত্যাহার ও ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল না করলে পোশাক খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন বা জোট নেতিবাচক প্রচারণা অব্যাহত রাখলে দেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে বলে স্বীকার করেন পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি সম্প্রতি বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা না জেনেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলো আন্দোলন করছে। আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাকে (আইএলও) বিস্তারিতভাবে পুরো ঘটনা জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কারখানাগুলোকে বলে দিয়েছি, কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা যাবে না। শুধু হামলা-ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তারপরও কোনো নিরীহ শ্রমিক হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমন অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
এর আগে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন হয়। তখন শ্রমিকদের টানা ধর্মঘটের একপর্যায়ে ৫৯টি কারখানা চার দিন বন্ধ রাখে বিজিএমইএ। পাশাপাশি নয়টি মামলা করে কারখানার মালিক ও পুলিশ প্রশাসন। সেসব মামলায় শ্রমিকনেতাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো আন্দোলন করে। তাদের প্রচারের কারণে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা অ্যাপারেল সামিট বর্জন করে বিশ্বখ্যাত পাঁচ ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, সিঅ্যান্ডএ, নেক্সট ও চিবো। পুরো বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায় বাংলাদেশ। শেষে সমঝোতায় পৌঁছান মালিকেরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতার বলেন, শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করেন এবং কারখানার মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের প্রিয়ভাজন নন, এমন শ্রমিকদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে হয়রানি করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মজুরিসংক্রান্ত যৌক্তিক আন্দোলন করেও মামলা ও ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়ায় শ্রমিকেরা আতঙ্কে আছেন। পোশাক শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনের কারণে বহির্বিশ্ব থেকেও প্রশ্ন উঠছে। তাই সরকার ও মালিকপক্ষের উচিত হবে বিশেষ বিবেচনায় মামলাগুলো প্রত্যাহার করা।